জি-লাইভ ডেস্ক
প্রকাশ: ৯ই আগস্ট ২০২৬, ১২:১৩ পিএম

১৯৭১ সালে বীর বাঙালির অস্ত্র হাতে বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামের পাশাপাশি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে পরিচালিত মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধও এক ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিল। এই শব্দযুদ্ধের অন্যতম দিকপাল ছিলেন একাত্তরের কিংবদন্তি শব্দসৈনিক এম. আর. আখতার মুকুল। প্রথাবিরোধী ও ব্যঙ্গাত্মক ভাষা শৈলীতে রচিত ও অনবদ্য ভঙ্গিতে পঠিত তাঁর ‘চরমপত্র’ অনুষ্ঠানটি অবরুদ্ধ দেশের সাধারণ মানুষ ও রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মনস্তাত্ত্বিক মনোবল জোগাতে অসাধারণ অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল। ৯ আগস্ট এই মহান শব্দযোদ্ধার জন্মদিন।
Table of Contents
১৯২৯ সালের ৯ আগস্ট বগুড়ার প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক মহাস্থানগড়ের নিকটবর্তী চিংগাসপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন মুস্তাফা রওশন আখতার মুকুল, যিনি পরবর্তীতে এম. আর. আখতার মুকুল নামে সুপরিচিত হন। তাঁর পিতা সাদত আলী আখন্দ ছিলেন বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও গবেষক এবং মাতা রাবেয়া খাতুন। দেশবরেণ্য শিক্ষাবিদ, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোস্তফা নূর-উল ইসলাম ছিলেন তাঁর আপন ভাই।
রাজনৈতিক চেতনায় সমৃদ্ধ পরিবারে বেড়ে ওঠার কারণে ছাত্রজীবন থেকেই তিনি প্রগতিশীল রাজনীতি ও নানা ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে পড়েন। ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণের কারণে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর রোষাণলে পড়ে জীবনের প্রারম্ভেই তাঁকে একাধিকবার কারাবরণ করতে হয়। তবে প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও তিনি শিক্ষার পথ থেকে সরে যাননি। ১৯৪৮-৪৯ সালে কারাবন্দী অবস্থায় থেকেই তিনি স্নাতক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন এবং অত্যন্ত কৃতিত্বের সঙ্গে ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে ১৯৫১ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতি বিষয়ে স্নাতকোত্তর (এম.এ) ডিগ্রি সম্পন্ন করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষা শেষ করার পর তিনি বৈচিত্র্যময় কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। বীমা কোম্পানি, বেসরকারি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, বিজ্ঞাপনী সংস্থা, দুর্নীতি দমন বিভাগ এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন সংস্থায় দায়িত্ব পালন করলেও সাংবাদিকতাই ছিল তাঁর মূল ধ্যান-জ্ঞান ও দীর্ঘতম কর্মক্ষেত্র।
তিনি তৎকালীন সময়ের শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্র ‘দৈনিক আজাদ’, ‘দৈনিক ইত্তেফাক’ এবং ‘দৈনিক পূর্বদেশ’-এ অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কর্মদক্ষতার স্বাক্ষর রেখে পরবর্তীতে তিনি আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা ‘ইউনাইটেড প্রেস ইন্টারন্যাশনাল’ (UPI)-এর ঢাকা ব্যুরো প্রধানের পদ অলঙ্কৃত করেন।
সাংবাদিকতা ও লেখালেখিতে সুদীর্ঘ অভিজ্ঞতা থাকলেও ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে রচিত ‘চরমপত্র’ অনুষ্ঠানটিই এম. আর. আখতার মুকুলকে ইতিহাসের পাতায় চিরস্মরণীয় করে রেখেছে। চারদিকে যখন গণহত্যা, নিপীড়ন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও শরণার্থী শিবিরের অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট, ঠিক তখনই স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে ভেসে আসত তাঁর স্বকীয় ধাঁচের কণ্ঠস্বর।
‘চরমপত্র’-এর প্রধান বৈচিত্র্য ছিল ঢাকাইয়া আঞ্চলিক ভাষা ও তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ-রসিকতার প্রয়োগ। সাধারণ মানুষের মুখে মুখে ফেরা ভাষায় তিনি পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ও তাদের দোসরদের পরাজয়কে হাস্যরসাত্মক কিন্তু কঠোর কণ্ঠে ফুটিয়ে তুলতেন। উদাহরণস্বরূপ, তাঁর বহুল পঠিত একটি বাক্য ছিল:
“বর্ষা আগত, সারাদেশ জলমগ্ন হবে। পাকি’রা সাঁতার জানে না। বিচ্ছুরা শুধু ওদের স্পিডবোট ফুটো করে দেবে। তারপরই কেল্লা ফতে…”
এটি নিছক হাস্যরস ছিল না; রণাঙ্গনে যুদ্ধরত মুক্তিযোদ্ধা এবং অবরুদ্ধ বাংলাদেশে মৃত্যুভয়ে তটস্থ সাধারণ মানুষের হৃদয়ে এটি বুনে দিয়েছিল এক অদম্য বিজয়ের স্বপ্ন।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাঙালি জাতির কাঙ্ক্ষিত বিজয় অর্জিত হয় এবং পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করে। এই ঐতিহাসিক ও আনন্দের দিনে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত চরমপত্রের শেষ পর্বে এম. আর. আখতার মুকুল স্বকীয় শৈলীতে এই কথিকার সমাপ্তি ঘোষণা করেন। বিজয়ের চূড়ান্ত মুহূর্তে নিজের পরিচয় প্রকাশ করে তিনি বলেন:
“আইজ ১৬ই ডিসেম্বর। চরমপত্রের শ্যাষের দিন আপনাগো বান্দার নামটা কইয়া যাই। বান্দার নাম এম. আর. আখতার মুকুল।”
এই ঐতিহাসিক ঘোষণার মধ্য দিয়ে সমাপ্তি ঘটে শব্দযুদ্ধের এক অনবদ্য অধ্যায়ের, যা মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাংস্কৃতিক স্মারক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে তিনি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের ‘ডিরেক্টর জেনারেল অফ ইনফরমেশন’ পদে নিযুক্ত হন। পরবর্তীতে ১৯৭২ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ বেতারের মহাপরিচালক (ডিজি) হিসেবে সফলতার সঙ্গে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৫ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত তিনি লন্ডনে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশনে প্রেস কাউন্সেলর হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
১৯৭৫ সালের পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে তাঁকে দীর্ঘ সময় প্রবাস জীবনযাপন করতে হয়। পরবর্তীতে দেশে ফিরে ১৯৮৭ সালে সরকারের নির্দেশে স্বাধীনতার ইতিহাস সংরক্ষণের অংশ হিসেবে ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্র’ সম্পাদনার দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এছাড়া গবেষণা ও প্রকাশনা অঙ্গনেও তাঁর অসামান্য অবদান রয়েছে; বিশেষত ‘সাগর পাবলিশার্স’-এর সঙ্গে তাঁর নিবিড় সম্পৃক্ততা বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চাকে সমৃদ্ধ করেছে।
দীর্ঘদিন মরণব্যাধি ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াই করার পর ২০০৪ সালের ২৬ জুন এই মহান শব্দসৈনিক শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। শারীরিকভাবে পৃথিবী ছেড়ে গেলেও তাঁর সৃষ্ট ‘চরমপত্র’ এবং মুক্তিযুদ্ধে বেতারের মাধ্যমে তিনি যে সাহস ও জোগানের সঞ্চার করেছিলেন, তা চিরকাল গণমানুষের স্মৃতিতে অম্লান হয়ে থাকবে। জন্মদিনে এই বীর শব্দযোদ্ধার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।
মন্তব্য