জি- লাইভ ডেস্ক
প্রকাশ: ৮ই আগস্ট ২০২৬, ১০:৪৭ পিএম

মাথার ওপর নিশ্চিন্ত একখণ্ড ছাদ নেই, ঘরে নেই সামান্য খাবার। একদিকে কোলের দুই সন্তানের ক্ষুধার তীব্র জ্বালা, অন্যদিকে মাথার ওপর আশ্রয় খোঁজার আকুতি— জীবনসংগ্রামের এই কঠিন বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে নিজের মাথার চুল বিক্রি করে ঘরভাড়া শোধ করতে বাধ্য হয়েছেন এক মা। এত ত্যাগের পরও শেষ রক্ষা হয়নি। শেষ পর্যন্ত সেই জীর্ণ ঝুপড়ি ঘরটি ছেড়ে দিয়ে দুই সন্তানকে আঁকড়ে ধরে এখন তাঁকে দিন কাটাতে হচ্ছে খোলা আকাশের নিচে।
মর্মস্পর্শী এই ঘটনাটি ঘটেছে বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার সন্তোষপুর গ্রামে। অসহায় এই নারীর নাম রেহানা খাতুন। পারিবারিক কোন্দল ও অভাবের তাড়নায় স্বামী তাঁকে দুই সন্তানসহ ফেলে চলে যাওয়ার পর থেকেই চরম অনিশ্চয়তা আর দারিদ্র্যের মুখে পড়েন তিনি।
স্থানীয় অধিবাসীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দুই সন্তানকে নিয়ে বাঁচার তাগিদে সন্তোষপুর গ্রামে একটি ছোট ঝুপড়ি ঘর ভাড়া নিয়েছিলেন রেহানা। তবে নিয়মিত কাজ না থাকায় মাস শেষে সামান্য ঘরের ভাড়া জোগাড় করাও তাঁর জন্য অসম্ভব হয়ে ওঠে। কিছুদিন আগে বকেয়া থাকা মাত্র ৫০০ টাকা ঘরভাড়া মেটাতে না পেরে চরম নিরুপায় হয়ে নিজের মাথার দীর্ঘ চুল কেটে বাজারে বিক্রি করে দেন। চুল বিক্রির সেই সামান্য টাকা বাড়িওয়ালার হাতে তুলে দিয়ে সাময়িকভাবে মাথা গোঁজার ঠাঁই রক্ষা করলেও দারিদ্র্যের কাছে হার মানতে হয় শেষমেশ। কয়েক মাসের বকেয়া আর অর্থাভাবের কারণে সেই ঝুপড়ি ঘরটিও ছাড়তে হয় তাঁকে।
ঘর ছাড়ার পর থেকেই দুই সন্তানকে নিয়ে ঘুরে বেড়াতে হচ্ছে রেহানাকে। কখনো প্রতিবেশীর বাড়ির উঠানে, আবার কখনো খুলনা-মোংলা রেললাইনের পাশে অরক্ষিত খোলা জায়গায় রাত কাটাতে হচ্ছে তাদের।
বর্তমানে রামপালের সন্তোষপুর গ্রামের প্রবেশমুখে রেলব্রিজের পাশে সরকারি জায়গায় বাঁশের খুঁটি দিয়ে একটি ঘরের কাঠামো দাঁড় করানোর চেষ্টা করছেন রেহানা। স্থানীয় কয়েকজন দয়ালু মানুষের সহায়তায় দেওয়া বাঁশ দিয়ে ফ্রেমটি দাঁড় করানো হলেও টিন ও বেড়া দেওয়ার কোনো আর্থিক সামর্থ্য তাঁর নেই। ফলে ঘরটি এখনও বসবাসের উপযোগী হয়ে ওঠেনি। রোদ, বৃষ্টি আর ঝোড়ো বাতাসের মুখোমুখি হয়ে বাঁশের সেই অসম্পূর্ণ কঙ্কালের নিচেই সন্তানদের নিয়ে প্রহর গুনছেন তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দা ফেরদৌসী বেগম আবেগপ্লুত কণ্ঠে বলেন, “মাথা গোঁজার ঠাঁই না থাকায় রেহানা কিছুদিন অন্য এক প্রতিবেশীর চালার নিচে ছিল। সেখানে ৫০০ টাকা ঘরভাড়া মেটাতে নিজের মাথার চুল বিক্রি করে দেয়। একদিন হুট করে তার মাথায় চুল না দেখে কারণ জানতে চাইলে রেহানা কেঁদে ফেলে বলেছিল, ‘ও বু, কাউরে কইও না। ঘরের ভাড়া মেটাতে ৫০০ টাকায় আমার চুলগুলো বেচে দিছি।’ এই কথা শোনার পর চোখের জল ধরে রাখা যায় না।”
গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা আবু তালেব শেখ ও মহিদুল ইসলাম জানান, বাঁশের ফ্রেমটি তৈরি রয়েছে, এখন কয়েকটি টিন আর বেড়ার ব্যবস্থা হলেই পরিবারটির একটি মাথা গোঁজার ঠাঁই হয়। সরকার ও বিত্তবানদের দ্রুত এই পরিবারের পাশে দাঁড়ানো উচিত।
কান্নায় ভেঙে পড়ে রেহানা খাতুন বলেন, “আমার ছোট দুইটা বাচ্চার মুখের দিকে তাকাতে পারি না। একদিকে থাকার ঘর নেই, অন্যদিকে খাবারের কষ্ট। উপায় না পেয়ে নিজের চুল কেটে বিক্রি করেছিলাম। আজ আমার চাওয়া খুব বেশি কিছু নয়, শুধু মাথার ওপর একটি টিনের ছাউনি চাই। যেন বৃষ্টি এলে বাচ্চাদের নিয়ে ভিজতে না হয়।”
রামপালের সন্তোষপুর গ্রামের বাসিন্দারা আকুল দাবি জানিয়েছেন, অসহায় এই পরিবারটিকে দ্রুত সরকারি কোনো আবাসন প্রকল্পের আওতায় এনে একটি নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা হোক। পাশাপাশি সমাজের মানবিক মানুষেরাও যেন এই পরিবারের দিকে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন।
মন্তব্য