বাংলাদেশের বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা, কলাম লিখন এবং সমাজ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে এক উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব ছিলেন বিভুরঞ্জন সরকার। দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি তাঁর লেখনী ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে দেশের গণমাধ্যম অঙ্গনকে সমৃদ্ধ করেছেন। একাধারে সাংবাদিক, কলামিস্ট, সম্পাদক ও নিবেদিত লেখক হিসেবে তিনি দেশের প্রগতিশীল চিন্তা চেতনাকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন।
Table of Contents
জন্ম, শিক্ষাজীবন ও ছাত্ররাজনীতি
বিভুরঞ্জন সরকার ১৯৫৪ সালের ৬ জুন পঞ্চগড় জেলার বোদা উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু হয় বোদা পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে। এরপর তিনি দিনাজপুর সরকারি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। ১৯৭৩ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে তাঁর সর্বোচ্চ শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জন করেন।
ষাটের দশকের শেষভাগে স্কুলছাত্র থাকা অবস্থাতেই ‘দৈনিক আজাদ’ পত্রিকার মফস্বল প্রতিনিধি হিসেবে সাংবাদিকতায় তাঁর হাতেখড়ি হয়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি তিনি প্রগতিশীল ছাত্ররাজনীতির সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। তিনি তৎকালীন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের দিনাজপুর জেলা কমিটির সহ-সভাপতি এবং পরবর্তীকালে কেন্দ্রীয় সংসদের সহকারী সাধারণ সম্পাদকের মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করেন।
কর্মজীবন ও সম্পাদনা
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেই বিভুরঞ্জন সরকার সাংবাদিকতাকে তাঁর স্থায়ী পেশা হিসেবে বেছে নেন। কর্মজীবনে তিনি সাপ্তাহিক জয়ধ্বনি, একতা, যায়যায়দিন, দৈনিক সংবাদ এবং দৈনিক রূপালীসহ দেশের বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় ও প্রভাবশালী গণমাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।
সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি একজন সফল সম্পাদক হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করেন। তিনি সাপ্তাহিক চলতিপত্র, দৈনিক মাতৃভূমি এবং সাপ্তাহিক মৃদুভাষণ পত্রিকাগুলো দক্ষতার সাথে সম্পাদনা করেছেন। আশির দশকের মধ্যভাগে জনপ্রিয় সাপ্তাহিক যায়যায়দিন পত্রিকায় ‘তারিখ ইব্রাহিম’ ছদ্মনামে লেখা তাঁর রাজনৈতিক নিবন্ধ ও কলামগুলো পাঠকমহলে ব্যাপক সমাদৃত ও আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। তাঁর তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক বিশ্লেষণ, স্পষ্ট বক্তব্য এবং সময়োপযোগী পর্যবেক্ষণ দেশের সাংবাদিকতায় এক নতুন মাত্রা যোগ করে।
জীবনাবসানের পূর্ব পর্যন্ত তিনি দেশের প্রথম অনলাইন সংবাদমাধ্যম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম এবং দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন, ইত্তেফাক, যুগান্তর, সংবাদ ও বর্তমানসহ বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে নিয়মিত কলাম লিখে গেছেন।
সাহিত্যকর্ম ও গ্রন্থ প্রকাশনা
একজন সমাজ-সচেতন লেখক হিসেবেও বিভুরঞ্জন সরকারের অবদান অনস্বীকার্য। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ১০টিরও বেশি। ২০২৩ সালের অমর একুশে বইমেলায় আগামী প্রকাশনী থেকে তাঁর দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বই প্রকাশিত হয়। গ্রন্থ দুটি হলো—
‘বঙ্গবন্ধু: ইতিহাসের নির্মাতা’
‘শেখ হাসিনা: স্বপ্ন পূরণের সফল কারিগর’
জীবনাবসান ও প্রস্থান
২০২৫ সালের ২১ আগস্ট এই প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিত্ব রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরীর বাসভবন থেকে বের হওয়ার পর আর ফিরে আসেননি। পরদিন অর্থাৎ ২২ আগস্ট মুন্সিগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার মেঘনা নদী থেকে পুলিশ তাঁর মৃতদেহ উদ্ধার করে। তাঁর এই আকস্মিক ও বেদনাদায়ক প্রস্থান দেশের সাংবাদিকতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক মহলে গভীর শোকের ছায়া ফেলেছিল। দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির কারণে তিনি জীবনের শেষ সময়ে এসে গভীর সংকটের মুখোমুখি হয়েছিলেন।
বিভুরঞ্জন সরকারের জীবন ও কর্মের সংক্ষিপ্ত প্রোফাইল
বিভুরঞ্জন সরকারের জীবন, শিক্ষা, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং কর্মজীবনের উল্লেখযোগ্য তথ্যাদি নিচে টেবিলের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| বিষয় | সুনির্দিষ্ট বিবরণ ও তথ্য |
| জন্ম ও জন্মস্থান | ৬ জুন, ১৯৫৪; বোদা উপজেলা, পঞ্চগড় জেলা। |
| শিক্ষাজীবন | বোদা পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়, দিনাজপুর সরকারি কলেজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ। |
| রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা | বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন (দিনাজপুর জেলার সহ-সভাপতি ও কেন্দ্রীয় সহকারী সাধারণ সম্পাদক)। |
| সাংবাদিকতার শুরু | ষাটের দশকের শেষভাগে, ‘দৈনিক আজাদ’ পত্রিকার মফস্বল প্রতিনিধি হিসেবে। |
| উল্লেখযোগ্য ছদ্মনাম | ‘তারিখ ইব্রাহিম’ (সাপ্তাহিক যায়যায়দিন-এ রাজনৈতিক কলাম লেখার জন্য ব্যবহৃত)। |
| সম্পাদিত পত্রিকাসমূহ | সাপ্তাহিক চলতিপত্র, দৈনিক মাতৃভূমি এবং সাপ্তাহিক মৃদুভাষণ। |
| কাজের পরিধি (অন্যান্য পত্রিকা) | সাপ্তাহিক জয়ধ্বনি, একতা, যায়যায়দিন, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক রূপালী, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, বাংলাদেশ প্রতিদিন, ইত্তেফাক, যুগান্তর ও বর্তমান। |
| প্রকাশিত গ্রন্থ | ১০টিরও বেশি (উল্লেখযোগ্য: ‘বঙ্গবন্ধু: ইতিহাসের নির্মাতা’ এবং ‘শেখ হাসিনা: স্বপ্ন পূরণের সফল কারিগর’)। |
| মৃত্যু ও মরদেহ উদ্ধার | ২১ আগস্ট ২০২৫ নিখোঁজ; ২২ আগস্ট ২০২৫ মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ার মেঘনা নদী থেকে মরদেহ উদ্ধার। |
আজ ৬ জুন, এই প্রগতিশীল চিন্তাবিদ, নির্ভীক কলামিস্ট ও সমাজ-রাজনীতির নিবেদিত পর্যবেক্ষকের জন্মদিনে তাঁর কর্মনিষ্ঠা, সততা এবং সাহসী লেখনীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করা হচ্ছে। বাংলা সাংবাদিকতার ইতিহাসে তাঁর অবদান ও সৃষ্টিশীল উচ্চারণ স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
