লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের ঐতিহাসিক বোফোর্ট দুর্গে অবস্থানরত ইসরায়েলি সেনাদের একটি সামরিক ট্যাংক লক্ষ্য করে শক্তিশালী মিসাইল হামলা চালিয়েছে দেশটির সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ। সফল এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইসরায়েলি বাহিনীর একটি অত্যাধুনিক ‘মারকাভা’ ট্যাংক সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে বলে হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে। গত মে মাসের শেষ দিকে ইসরায়েলি বাহিনী কর্তৃক বোফোর্ট দুর্গটি নিয়ন্ত্রণের নেওয়ার পর থেকে ওই এলাকায় দুই পক্ষের মধ্যে সংঘাত ও উত্তেজনা তীব্র আকার ধারণ করেছে।
বোফোর্ট দুর্গের নিয়ন্ত্রণ এবং হিজবুল্লাহর ড্রোন প্রযুক্তি
গত ৩১ মে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলীয় নাবিতেহ শহরের নিকটবর্তী কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বোফোর্ট দুর্গটি নিজেদের দখলে নেয় ইসরায়েলি সেনারা। এই দুর্গটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ঘটনাকে লেবাননের প্রতিরোধ যোদ্ধা তথা হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে নিজেদের একটি বড় ধরনের প্রতীকী জয় হিসেবে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রচার করে আসছিল ইসরায়েল। তবে দুর্গটি দখলের পর থেকেই সেখানে অবস্থান নেওয়া ইসরায়েলি সেনাদের ওপর অব্যাহত ও সুনির্দিষ্টভাবে পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে হিজবুল্লাহর যোদ্ধারা।
সামরিক সূত্র ও প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, বোফোর্ট দুর্গ ইসরায়েলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত হিজবুল্লাহর ধারাবাহিক হামলায় ইসরায়েলের একাধিক সেনা সদস্য নিহত হয়েছেন। এর পাশাপাশি গুরুতর আহত হয়েছেন আরও বহু সেনা সদস্য। হিজবুল্লাহ মূলত এই অঞ্চলের প্রতিরোধ যুদ্ধে উন্নত প্রযুক্তির ‘ফাইবার অপটিক ড্রোন’ ব্যবহার করছে। ড্রোনগুলো ফাইবার অপটিক প্রযুক্তির হওয়ার কারণে ইসরায়েলি বাহিনীর আধুনিক রাডার বা প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এগুলোকে জ্যাম করতে কিংবা আগাম শনাক্ত করতে সক্ষম হচ্ছে না। ফলে হিজবুল্লাহর এই ড্রোনগুলো অত্যন্ত আকস্মিকভাবে ইসরায়েলি সেনাদের অবস্থানের ওপর আছড়ে পড়ছে এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বাড়িয়ে তুলছে।
বোফোর্ট দুর্গে ট্যাংক ধ্বংসের পাশাপাশি কালাত আল-শরিফ নামক স্থানে ইসরায়েলি বাহিনীর তৈরি করা একটি গুরুত্বপূর্ণ লজিস্টিক সাপোর্ট বা রসদ সরবরাহ কেন্দ্রেও সফল হামলা চালিয়েছে লেবাননের এই সশস্ত্র গোষ্ঠী। ভৌগোলিকভাবে কালাত আল-শরিফ এলাকাতেই এই ঐতিহাসিক বোফোর্ট দুর্গটি অবস্থিত।
আইআরজিসি-র হুঁশিয়ারি ও ইরানের বার্তা
লেবাননের ভূখণ্ড থেকে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার করা না হলে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে কোনোভাবেই শান্তি ফিরে আসবে না বলে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। ৪ জুন (বৃহস্পতিবার) আইআরজিসির পক্ষ থেকে প্রকাশিত একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এই হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে বলে ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম নিউজ এজেন্সি তাদের প্রতিবেদনে নিশ্চিত করেছে।
প্রকাশিত বিবৃতিতে আইআরজিসি স্পষ্ট করে বলেছে যে, আঞ্চলিক যুদ্ধে তাদের যুদ্ধবিরতি মেনে নেওয়ার প্রাথমিক ও প্রধান শর্তই ছিল লেবাননসহ চলমান সব ফ্রন্টে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা। বিবৃতিতে শত্রুপক্ষকে উদ্দেশ্য করে আরও বলা হয়, শত্রুপক্ষকে অবশ্যই লেবাননের সাধারণ জনগণের ওপর তাদের চলমান অন্যায় হামলা জরুরি ভিত্তিতে সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। সেই সাথে ইসরায়েলি বাহিনীকে লেবাননের সকল অধিকৃত এলাকা খালি করে অবিলম্বে আন্তর্জাতিক সীমান্তের পেছনে পিছু হটতে হবে এবং লেবাননের আঞ্চলিক অখণ্ডতাকে পূর্ণ স্বীকৃতি দিতে হবে।
হিজবুল্লাহ প্রধানের political অবস্থান ও প্রতিক্রিয়া
অন্য দিকে, ইরান-সমর্থিত লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর বর্তমান সাধারণ সম্পাদক নাইম কাসেম এক পৃথক বিবৃতিতে লেবানন সরকার এবং ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের মধ্যকার বর্তমান সমন্বয় ও সরাসরি আলোচনার তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি এই চলমান যুদ্ধবিরতির বিনিময়ে প্রতিরোধ বাহিনী হিজবুল্লাহর দীর্ঘদিনের অস্ত্র সমর্পণের ধারণারও কঠোর বিরোধিতা ও সমালোচনা প্রকাশ করেন। হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে যে, সার্বভৌমত্ব ও ভূখণ্ডের অখণ্ডতা রক্ষা না করে কোনো প্রকার আপস বা একতরফা আলোচনা মেনে নেওয়া হবে না।
