খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২ই আগস্ট ২০২৬, ৫:৩ পিএম

গুমোট গরমের মধ্যে মাঝেমধ্যে নামছিল হালকা বৃষ্টি। সেই আবহাওয়াকে উপেক্ষা করেই রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে জড়ো হয়েছিলেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত শত শত প্রার্থী। দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে দ্রুত পদায়নের দাবিতে তাঁরা অবস্থান কর্মসূচি পালন করছিলেন। শেষ পর্যন্ত তাঁদের দাবির বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সূচি ঘোষণা হলে স্বস্তি ফিরে আসে আন্দোলনকারীদের মধ্যে। এরপর তাঁরা রাজপথ ছেড়ে বাড়ির পথে ফেরেন।
বুধবার বেলা ১১টার পর শুরু হয় অবস্থান কর্মসূচি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ঘটনাস্থলে পুলিশ ব্যারিকেড দেয়। এতে শাহবাগ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিমুখী সড়কের এক পাশ দিয়ে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। তবে কর্মসূচির শুরুতেই ছিল ব্যতিক্রমী এক দৃশ্য। আন্দোলনকারীরা পুলিশের সঙ্গে কোনো ধরনের সংঘাতে না গিয়ে তাঁদের হাতে ফুল তুলে দেন। পরে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে তাঁরা কর্মসূচি শুরু করেন।
সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলনকারীদের উপস্থিতিও বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে অবস্থানকারীদের ভিড় শাহবাগ থেকে চারুকলা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগের অপেক্ষায় থাকা প্রার্থীরা হাতে বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড নিয়ে দ্রুত পদায়নের দাবি জানান। তাঁদের বক্তব্য ছিল, নিয়োগ প্রক্রিয়ার সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পরও কেন যোগদান ও পদায়নের জন্য এত দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে, তার কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা তাঁরা পাননি।
আন্দোলনকারীদের মধ্যে ছিলেন মুন্সিগঞ্জের সুইটি আক্তার শান্তা এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী শাহিনা আক্তার। দুজনেরই স্বপ্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করা। শিশুদের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ থেকেই তাঁরা এই পেশাকে বেছে নিয়েছেন। নিয়োগ পরীক্ষার দীর্ঘ প্রক্রিয়া পেরিয়ে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হওয়ার পর তাঁদের প্রত্যাশা ছিল দ্রুত কর্মস্থলে যোগ দিয়ে শিক্ষকতার দায়িত্ব শুরু করা। কিন্তু চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পরও সেই অপেক্ষা দীর্ঘ হতে থাকে।
গত ৮ ফেব্রুয়ারি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে ১৪ হাজার ৩৮৪ জনকে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত করা হয়। এরপর নির্বাচিত প্রার্থীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় সনদ যাচাইয়ের কাজ মার্চের মধ্যেই শেষ হয় বলে আন্দোলনকারীরা জানান। কিন্তু এসব আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পরও পদায়নের প্রজ্ঞাপন প্রকাশ না হওয়ায় তাঁদের অপেক্ষা বাড়তে থাকে।
প্রার্থীদের ভাষ্য অনুযায়ী, চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পর ১৭৫ দিন পেরিয়ে গেলেও তাঁরা চাকরিতে যোগদানের সুযোগ পাননি। দীর্ঘ এই অপেক্ষা অনেকের জন্য মানসিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আন্দোলনকারীরা দাবি করেন, এ সময়ের মধ্যে নির্বাচিত দুই প্রার্থী মারা গেছেন। এ ছাড়া অন্তত ১৫ জন নির্বাচিত প্রার্থীর মা-বাবা তাঁদের সন্তানকে চাকরিতে যোগ দিতে দেখে যেতে পারেননি।
অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া এক প্রার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কোথাও কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে তার দায় সাধারণ প্রার্থীদের ওপর বর্তানো উচিত নয়। তাঁর ভাষ্য, চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হওয়ার পর স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও সনদ যাচাইসহ প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। ফলে আর বিলম্ব না করে তাঁদের দ্রুত পদায়ন করা প্রয়োজন।
দুপুরের দিকে আন্দোলনকারীদের কাছে আসে কাঙ্ক্ষিত খবর। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত সহকারী শিক্ষকরা আগামী ১ অক্টোবর নিজ নিজ পদে যোগদান করবেন। এরপর ৪ অক্টোবর তাঁদের পদায়ন সম্পন্ন হবে।
নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণার খবর ছড়িয়ে পড়ার পরপরই আন্দোলনকারীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে আসে। দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তার অবসান ঘটায় অনেকেই আনন্দ প্রকাশ করেন। কেউ কেউ একে অপেক্ষার শেষ হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ বলছেন, এতদিনের উদ্বেগের পর অবশেষে তাঁরা ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চিত হতে পারছেন।
তবে রাজপথ ছাড়ার আগে আন্দোলনকারীরা রেখে যান একটি ভিন্ন বার্তা। তাঁরা ঝাড়ু ও বস্তা হাতে নিয়ে নিজেদের অবস্থানস্থল নিজেরাই পরিষ্কার করেন। কর্মসূচির কারণে শাহবাগ এলাকায় পড়ে থাকা ময়লা-আবর্জনা সংগ্রহ করে স্থানটি পরিষ্কার করে তাঁরা সেখান থেকে চলে যান।
দীর্ঘ ১৭৫ দিনের অপেক্ষার পর অবশেষে হাতে এসেছে যোগদান ও পদায়নের নির্দিষ্ট সময়সূচি। সেই স্বস্তির খবর নিয়েই শাহবাগ ছাড়েন সুইটি আক্তার শান্তা, শাহিনা আক্তারসহ তাঁদের মতো হাজারো নির্বাচিত প্রার্থী। তাঁদের সামনে এখন নতুন অপেক্ষা—১ অক্টোবর কর্মস্থলে যোগ দেওয়া এবং ৪ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে পদায়িত হয়ে দীর্ঘদিনের কাঙ্ক্ষিত শিক্ষকতা জীবন শুরু করা।
মন্তব্য