খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২ই আগস্ট ২০২৬, ৫:৩০ পিএম

ফিফার সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর নেতৃত্ব নিয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবল অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফার সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের টানাপোড়েন প্রকাশ্য রূপ পেয়েছে। বিশ্বকাপসহ ফিফার বাণিজ্যিক অধিকার পরিচালনার জন্য পৃথক একটি প্রতিষ্ঠান গঠন এবং সেখানে বেসরকারি বিনিয়োগ আনার যে পরিকল্পনা করা হয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত বাতিল করতে হয়েছে। তবে পরিকল্পনাটি প্রত্যাহার করলেও বিতর্ক থামেনি।
ইউরোপের পাশাপাশি এশিয়া ও উত্তর আমেরিকার ফুটবল প্রশাসনের একটি অংশও ফিফার বর্তমান নেতৃত্বের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এমন পরিস্থিতিতে ২০২৭ সালের ফিফা সভাপতি নির্বাচনকে ঘিরে ইনফান্তিনোর ভবিষ্যৎ নিয়ে জল্পনা বাড়ছে। তিনি নতুন করে নির্বাচনে দাঁড়াবেন কি না, কিংবা দাঁড়ালে তাঁর বিরুদ্ধে শক্ত কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী মাঠে নামবেন কি না—এসব প্রশ্ন এখন ফুটবল প্রশাসনের আলোচনার কেন্দ্রে।
এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থীদের তালিকা চূড়ান্ত হয়নি। এমনকি আলোচনায় থাকা বেশির ভাগ ব্যক্তিই প্রকাশ্যে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘোষণা দেননি। তারপরও আন্তর্জাতিক ফুটবল প্রশাসনের বিভিন্ন মহলে সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে কয়েকটি নাম ঘুরছে। তাঁদের মধ্যে আলোচনায় থাকা ছয়জন হলেন—
ভিক্টর মন্তাগ্লিয়ানি
সম্ভাব্য উত্তরসূরিদের তালিকায় সবচেয়ে বেশি আলোচিত নামগুলোর একটি কানাডার ফুটবল প্রশাসক ভিক্টর মন্তাগ্লিয়ানি। তিনি ২০১৬ সাল থেকে উত্তর, মধ্য আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা কনক্যাকাফের সভাপতি। একই সঙ্গে তিনি ফিফার সহসভাপতির দায়িত্বও পালন করছেন।
২০২৬ বিশ্বকাপের অন্যতম আয়োজক দেশ কানাডা। দেশটির বিশ্বকাপ আয়োজনের প্রক্রিয়ায় মন্তাগ্লিয়ানির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। উত্তর আমেরিকা অঞ্চলে তাঁর প্রভাব এবং ফিফার প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তাঁকে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বাড়তি সুবিধা দিতে পারে।
টকস্পোর্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কনক্যাকাফ ও উয়েফার সম্মিলিত ৯৬ ভোটের সঙ্গে আরও ১০টি ভোট সমর্থনে আনতে পারলে মন্তাগ্লিয়ানির জয়ের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তবে ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে সরাসরি নির্বাচনে দাঁড়ানোর বিষয়ে তিনি এখনো প্রকাশ্যে কোনো ঘোষণা দেননি।
শেখ সালমান বিন ইব্রাহিম আল খলিফা
এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের সভাপতি শেখ সালমান বিন ইব্রাহিম আল খলিফার নামও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছে। বাহরাইনের রাজপরিবারের এই সদস্য বর্তমানে এএফসির নেতৃত্বের পাশাপাশি ফিফার সিনিয়র সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন।
২০১৬ সালের ফিফা সভাপতি নির্বাচনে ইনফান্তিনোর কাছে পরাজিত হয়েছিলেন শেখ সালমান। ফলে ফিফার শীর্ষ পদে তাঁর আগ্রহের বিষয়টি নতুন নয়। সাম্প্রতিক সময়ে ইনফান্তিনোর কিছু বিতর্কিত পরিকল্পনার সমালোচনাতেও তাঁকে সরব হতে দেখা গেছে। এশিয়ার ফুটবল প্রশাসনে তাঁর শক্ত অবস্থান তাঁকে সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
আলেক্সান্দার সেফেরিন
ফিফা সভাপতির সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে সবচেয়ে বেশি আলোচিত ইউরোপীয় নামগুলোর মধ্যে রয়েছেন উয়েফা সভাপতি আলেক্সান্দার সেফেরিন। স্লোভেনিয়ার এই আইনজীবী বর্তমানে উয়েফার ৫৫টি সদস্য দেশের ফুটবল প্রশাসনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে ইনফান্তিনোর বিভিন্ন সিদ্ধান্তের অন্যতম সমালোচক হিসেবে সামনে এসেছেন সেফেরিন। তাঁর সঙ্গে ফিফা সভাপতির সম্পর্কেও টানাপোড়েনের খবর প্রকাশ্যে এসেছে। এমনকি ইনফান্তিনোর প্রতি অসন্তোষ থেকে বিশ্বকাপের ফাইনাল বয়কটের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
তবে সেফেরিন নিজে এখনো ফিফা সভাপতি পদে প্রার্থী হওয়ার কোনো ইঙ্গিত দেননি। বরং তাঁর বর্তমান ভূমিকা থেকে বোঝা যায়, তিনি উয়েফার ভেতরে ইনফান্তিনোর নীতির বিরোধিতা করা দেশগুলোর মধ্যে ঐক্য গড়ে তোলার দিকেই বেশি মনোযোগী।
ম্যাথিয়াস গ্রাফস্ট্রম
আলোচনায় থাকা আরেকটি নাম ফিফার বর্তমান মহাসচিব ম্যাথিয়াস গ্রাফস্ট্রম। সুইডিশ এই ক্রীড়া প্রশাসক ২০২৩ সাল থেকে ফিফার মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে তিনি সুইডিশ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন এবং এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের সঙ্গেও কাজ করেছেন।
ফিফার অভ্যন্তরীণ প্রশাসন সম্পর্কে তাঁর অভিজ্ঞতা এবং বিভিন্ন ফুটবল অঞ্চলের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ তাঁকে সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে আলোচনায় এনেছে। ইনফান্তিনোর বিতর্কিত কিছু প্রকল্পের সঙ্গে সরাসরি তাঁর নাম জড়ায়নি বলেও অনেকে মনে করেন। এ কারণে সভাপতি পদে পরিবর্তন এলে গ্রাফস্ট্রমকে গ্রহণযোগ্য বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করার পক্ষেও মত রয়েছে। এমনকি কেউ কেউ মনে করেন, ইনফান্তিনো সরে দাঁড়ালে অন্তর্বর্তীকালীন নেতৃত্বের দায়িত্বও তিনি নিতে পারেন।
নাসের আল-খেলাইফি
ফরাসি ক্লাব পিএসজির সভাপতি নাসের আল-খেলাইফির নামও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় এসেছে। কাতারের এই প্রভাবশালী ক্রীড়া প্রশাসক একই সঙ্গে বিইন মিডিয়া গ্রুপের চেয়ারম্যান এবং ইউরোপিয়ান ক্লাব অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন।
ফুটবল প্রশাসন ও সম্প্রচার ব্যবসা—দুই ক্ষেত্রেই তাঁর ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। ইউরোপের শীর্ষ ক্লাবগুলোর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগও তাঁকে আলাদা গুরুত্ব দিয়েছে। তবে টকস্পোর্টের প্রতিবেদনে তাঁর ঘনিষ্ঠ সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, আপাতত ফিফা সভাপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ইচ্ছা তাঁর নেই। পিএসজি, বিইন মিডিয়া গ্রুপ ও ইউরোপিয়ান ক্লাবস সংগঠনের দায়িত্বেই তিনি মনোযোগ দিতে চান। তবে ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি বদলালে তাঁর অবস্থানও পরিবর্তিত হতে পারে বলে আলোচনা রয়েছে।
প্যাট্রিস মোটসেপে
সম্ভাব্য প্রার্থীদের আলোচনায় রয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার ধনকুবের ব্যবসায়ী প্যাট্রিস মোটসেপেও। তিনি ২০২১ সাল থেকে আফ্রিকান ফুটবল কনফেডারেশনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আফ্রিকার ফুটবল প্রশাসনে তাঁর প্রভাব যথেষ্ট।
ফিফার নেতৃত্বে আফ্রিকা মহাদেশের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় থাকে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে মোটসেপের নামও গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে তাঁর সঙ্গে ইনফান্তিনোর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে বলে মনে করা হয়। ফলে বর্তমান সভাপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে মোটসেপের প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে কম—এমন ধারণাও রয়েছে।
২০২৭ সালের নির্বাচন যত এগিয়ে আসবে, সম্ভাব্য প্রার্থীদের সমীকরণ তত পরিষ্কার হতে পারে। ফিফা সভাপতি নির্বাচনে শুধু ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা নয়, বিভিন্ন মহাদেশের ফুটবল কনফেডারেশনের সমর্থনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে সম্ভাব্য কোনো প্রার্থী শেষ পর্যন্ত দাঁড়ালে তাঁকে ইউরোপ, এশিয়া, আফ্রিকা ও উত্তর আমেরিকার ভোটের সমীকরণ সামলাতে হবে।
এখন পর্যন্ত আলোচনায় থাকা ছয়জনের কেউই আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থিতা ঘোষণা করেননি। ফলে তালিকাটি পরিবর্তিত হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে ফিফার নেতৃত্ব নিয়ে চলমান বিতর্ক এবং ২০২৭ সালের নির্বাচনকে ঘিরে এই নামগুলোই আপাতত আন্তর্জাতিক ফুটবল প্রশাসনের আলোচনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
মন্তব্য