বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আসর ‘ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬’ শুরুর প্রাক্কালে ফুটবলপ্রেমীদের মাঝে ব্যাপক উদ্দীপনা বিরাজ করছে। আন্তর্জাতিক ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা কর্তৃক প্রকাশিত ৪৮টি দেশের অফিশিয়াল খেলোয়াড় তালিকা অনুযায়ী, এবারের আসরে যেমন একঝাঁক তরুণ প্রতিভার আগমন ঘটছে, তেমনই অভিজ্ঞ ফুটবলাররাও মাঠ মাতাতে প্রস্তুত হচ্ছেন। এই তালিকায় সবচেয়ে আকর্ষণীয় নাম হিসেবে উঠে এসেছে মেক্সিকোর উদীয়মান ফুটবলার গিলবার্তো মোরা। ২০২৬ বিশ্বকাপ শুরুর নির্দিষ্ট দিনে এই মেক্সিকান তরুণ তুর্কির বয়স হবে মাত্র ১৭ বছর ২৪০ দিন। এই বয়সের সুবাদে তিনি এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে কনিষ্ঠ ফুটবলার হিসেবে বিশ্বমঞ্চে পা রাখতে যাচ্ছেন।
Table of Contents
টিনএজারদের আধিপত্য এবং বিশ্বমঞ্চে অভিষেকের পরিসংখ্যান
ফিফার প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এবারের বিশ্ব আসরে রেকর্ডসংখ্যক ১,২৪৮ জন খেলোয়াড় নিজেদের দেশের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পেয়েছেন। এই বিশাল ফুটবলারদের বহরে মোট ২২ জন টিনএজার বা কিশোর ফুটবলার অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন, যাদের বয়স এখনো ২০ বছরের কোটা পার হয়নি। এই ২২ জন টিনএজারের মধ্যে মেক্সিকোর প্রতিভাবান মিডফিল্ডার গিলবার্তো মোরা সর্বকনিষ্ঠ হিসেবে খেলবেন। বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে নিজের ফুটবল প্রতিভার সর্বোচ্চ প্রমাণ দিয়ে ইতিহাসের পাতায় নতুন করে নাম লেখানোর এক অনন্য সুযোগ এখন এই মেক্সিকানের সামনে রয়েছে।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ফুটবল সম্রাট ও ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি পেলে এখনো পর্যন্ত বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে ফাইনালে গোল করার অনন্য রেকর্ডটি নিজের দখলে রেখেছেন। ১৯৫৮ সালের বিশ্বকাপে মাত্র ১৭ বছর বয়সে ব্রাজিলের শিরোপাজয়ী দলের অন্যতম সদস্য ছিলেন পেলে। পরবর্তীতে বিভিন্ন বিশ্বকাপে তরুণদের আলো ছড়ানোর নজির রয়েছে। যেমন, ২০১৮ সালে মাত্র ১৯ বছর বয়সে ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে বিশ্বমঞ্চে নিজের আগমনী বার্তা দিয়েছিলেন এবং দলের বিশ্বজয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন। তারও দুই দশক আগে, ১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের মাইকেল ওয়েন মাত্র ১৮ বছর বয়সে খেলতে নেমে ফুটবল বিশ্বে সাড়া ফেলেছিলেন।
ক্লাব ফুটবলে আলো ছড়ানো তরুণদের অন্তর্ভুক্তি
চলতি আসরে জায়গা করে নেওয়া বেশ কয়েকজন টিনএজার নিজ নিজ ক্লাবের হয়ে ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক ফুটবলে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স প্রদর্শন করেই জাতীয় দলে ডাক পেয়েছেন। স্পেনের দুই তরুণ ফুটবল তারকা—১৮ বছর বয়সী লামিন ইয়ামাল এবং ১৯ বছর বয়সী পও কুবারসি তাদের চমৎকার নৈপুণ্যের কারণে স্পেনের চূড়ান্ত স্কোয়াডে স্থান করে নিয়েছেন। একইভাবে জার্মানির ১৮ বছর বয়সী উদীয়মান তারকা লেনার্ট কার্ল জার্মান ক্লাব বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে অসাধারণ পারফরম্যান্সের মাধ্যমে নিজেকে স্পটলাইটে নিয়ে এসেছেন এবং জার্মানির বিশ্বকাপ দলে জায়গা নিশ্চিত করেছেন।
এছাড়াও এমন কিছু ফুটবলার এবারের আসরে ডাক পেয়েছেন যাদের বয়স ১৯ বছর পার হয়ে ২০ বা ২১ বছরে পা দিয়েছে এবং তারা প্রথমবারের মতো বিশ্বমঞ্চে দেশের জার্সি গায়ে মাঠে নামার অপেক্ষায় আছেন। ফ্রান্স দলের অন্যতম প্রধান দুই ভরসার নাম হলো ২০ বছর বয়সী ওয়ারেন জেইরি-এমেরে এবং ২১ বছর বয়সী ডিসায়ার ডুয়ে। এই দুই তরুণ ফুটবলারই ইউরোপের অন্যতম শীর্ষ ক্লাব এবং দুইবারের চ্যাম্পিয়নস লিগ বিজয়ী পিএসজির (প্যারিস সেন্ট জার্মেই) হয়ে নিয়মিত খেলে থাকেন। এর পাশাপাশি ২১ বছর বয়সী খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপে অভিষেকের প্রহর গুনছেন ইংল্যান্ডের নিকো ও’রিলি এবং তুরস্কের আরদা গুলার। বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ দলেও ঠাঁই করে নিয়েছেন ২১ বছর বয়সী তরুণ নিকো পাজ।
মেক্সিকান ফুটবলে মোরার উত্থানের পটভূমি
মেক্সিকোর লিগা এমএক্স-এ খেলা গিলবার্তো মোরা গত এক বছর ধরে দেশটির অন্যতম দ্রুত উদীয়মান তারকা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। আসন্ন বিশ্বকাপে মাঠে নামার সুযোগ পেলে তিনি মেক্সিকোর ফুটবল ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সী খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের এক নতুন রেকর্ড গড়বেন। এর আগে তিনি ২০২৫ সালের গোল্ড কাপ বিজয়ী মেক্সিকো জাতীয় দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন।
মোরার ক্যারিয়ারের রেকর্ড বুক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে মাত্র ১৫ বছর বয়সে মেক্সিকান প্রথম বিভাগের ফুটবল লিগে খেলতে নেমে তিনি দেশটির ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড়ের রেকর্ড গড়েন। এরপর তার পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতা বজায় থাকায় ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে মাত্র ১৬ বছর বয়সে মেক্সিকোর সিনিয়র জাতীয় দলে তার আন্তর্জাতিক অভিষেক ঘটে।
প্রবীণ ও অভিজ্ঞ ফুটবলারদের অবস্থান
তরুণদের পাশাপাশি এবারের বিশ্বকাপে অভিজ্ঞতার দিক থেকেও তৈরি হচ্ছে নতুন ইতিহাস। মেক্সিকোর গিলবার্তো মোরা যখন সবচেয়ে কনিষ্ঠ খেলোয়াড়, ঠিক তার বিপরীত প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছেন স্কটল্যান্ডের অভিজ্ঞ গোলরক্ষক ক্রেইগ গوردন। ৪৩ বছর ১৬২ দিন বয়সে তিনি এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে প্রবীণ বা বেশি বয়সী খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নামার গৌরব অর্জন করতে যাচ্ছেন।
ক্রেইগ গর্ডন ছাড়াও পর্তুগালের ৪১ বছর বয়সী অভিজ্ঞ অধিনায়ক ও ফুটবল মহাতারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোসহ ৪০ বছরের বেশি বয়সী আরও ছয়জন ফুটবলার এবারের আসরে নিজ নিজ দেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন। ফিফার অফিশিয়াল তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে যে, এবারের আসরে অংশ নেওয়া খেলোয়াড়দের মধ্যে ৩৫৭ জন ফুটবলারের অতীতে অন্তত একটি বিশ্বকাপে খেলার পূর্ব অভিজ্ঞতা রয়েছে। বিপরীতে, অবশিষ্ট ৮৯১ জন খেলোয়াড়ের জন্য এটিই হতে যাচ্ছে জীবনের প্রথম বিশ্বকাপ, যা তাদের ক্যারিয়ারে সম্পূর্ণ নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করবে।
