খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৩১ই মে ২০২৬, ১১:৫৪ পিএম

মিয়ানমারের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে খনিজ উত্তোলনের কাজে ব্যবহারের জন্য মজুত করে রাখা বিস্ফোরকের একটি গুদামে ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এই দুর্ঘটনায় শিশুসহ ৪৫ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে। আজ রোববার দুপুরে চীন সীমান্তবর্তী একটি জনপদে ঘটা এই আকস্মিক বিস্ফোরণে আরও অর্ধশতাধিক মানুষ গুরুতরভাবে আহত হয়েছে। স্থানীয় উদ্ধারকারী দল এবং মিয়ানমারের একাধিক গণমাধ্যমের বরাতে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এপি (অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস) এই তথ্যটি জনসমক্ষে প্রকাশ করেছে।
Table of Contents
বার্তা সংস্থা এপির প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, আজ রোববার দুপুর ১২টার দিকে মিয়ানমারের নামখাম জনপদের অন্তর্গত কাউংটুপ গ্রামে এই ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনাটি ঘটে। দুর্ঘটনাকবলিত কাউংটুপ গ্রামটি ভৌগোলিক দিক থেকে চীন সীমান্ত থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার (দুই মাইল) দক্ষিণে অবস্থিত।
উল্লেখ্য, এই সীমান্ত সংলগ্ন অঞ্চলটি বর্তমানে মিয়ানমারের ক্ষমতাসীন সামরিক জান্তা সরকারবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠী ‘তাং ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি’ (টিএনএলএ)-এর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
বিস্ফোরণের খবর পাওয়ার পরপরই স্থানীয় উদ্ধারকারী দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুর্ঘটনাস্থলে উপস্থিত একজন উদ্ধারকর্মী জানিয়েছেন, আজ রোববার সন্ধ্যা পর্যন্ত দুর্ঘটনাস্থলের ধ্বংসস্তূপ থেকে ছয়জন শিশুসহ মোট ৪৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। উদ্ধারকৃত এই মরদেহগুলো পরবর্তীতে ধর্মীয় শেষকৃত্যের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বিস্ফোরণে আহত অন্তত ৭৪ জনকে উদ্ধার করে তাৎক্ষণিকভাবে স্থানীয় বিভিন্ন হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে এবং দুর্ঘটনাস্থলে তখন পর্যন্ত উদ্ধার অভিযান অব্যাহত ছিল।
নামখাম এলাকার অন্য একজন উদ্ধারকর্মী মিয়ানমারের গণমাধ্যমকে জানান, তাদের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী বিস্ফোরণের তীব্রতায় প্রায় ৪০ জন নিহত হয়েছে। এছাড়া দুর্ঘটনাস্থলের আশপাশে থাকা শতাধিক ঘরবাড়ি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও ধসে পড়েছে।
অন্যদিকে, শান রাজ্যের স্থানীয় অনলাইন সংবাদমাধ্যম ‘শওয়ে ফি মায়ায়’ সহ মিয়ানমারের বেশ কিছু আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যম দাবি করেছে যে, এই দুর্ঘটনায় নিহতের প্রকৃত সংখ্যা ৫০ থেকে ৫৫ জনের কাছাকাছি। গণমাধ্যমগুলোতে প্রকাশিত বিভিন্ন ছবি ও ভিডিওচিত্রে দেখা গেছে, বিস্ফোরণের পর দুর্ঘটনাস্থলের চারদিকের আকাশে বিশাল ধোঁয়ার কুণ্ডলী উড়ছে এবং ধসে পড়া ঘরবাড়ির ধ্বংসস্তূপ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি এই ঘটনার বিষয়ে জানিয়েছে যে, প্রাথমিক তদন্তের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী খনির কাজে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে একটি নির্দিষ্ট ভবনে বিপুল পরিমাণ শক্তিশালী বিস্ফোরক অবৈধ বা অনিয়ন্ত্রিতভাবে মজুত করে রাখা হয়েছিল। সেই মজুতকৃত বিস্ফোরক থেকেই মূলত এই ভয়াবহ বিস্ফোরণের সূত্রপাত ঘটে। এই ঘটনার পর স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দাদের জরুরি ত্রাণ, চিকিৎসা ও সাময়িক পুনর্বাসন সহায়তা দেওয়ার কাজ শুরু করেছে।
ভয়াবহ এই বিস্ফোরণের পর তাং ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি (টিএনএলএ) তাদের নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টেলিগ্রাম চ্যানেলে দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে দুর্ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছে। তাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, মূলত খনি এবং পাথর কোয়ারির বা পাথর ভাঙার কাজের জন্য ওই গুদামটিতে ‘জেলিগনাইট’ নামের এক ধরনের বিশেষ ও শক্তিশালী বিস্ফোরক মজুত করে রাখা হয়েছিল।
তবে ঠিক কী কারণে বা কোন ত্রুটি থেকে এই আকস্মিক বিস্ফোরণটি ঘটল, তা সুনির্দিষ্টভাবে খতিয়ে দেখতে ইতিমধ্যেই তাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞদের মতে, খনি ও পাথর ভাঙার মতো ভারী কাজে বিশ্বজুড়ে বহুলভাবে ব্যবহৃত এই জেলিগনাইট অত্যন্ত সংবেদনশীল। এটি দীর্ঘদিন ধরে সঠিক তাপমাত্রা ও বৈজ্ঞানিক নিয়মে রক্ষণাবেক্ষণ বা সংরক্ষণ করা না হলে তা চরম বিপজ্জনক, রাসায়নিকভাবে অস্থিতিশীল ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিস্ফোরক হয়ে উঠতে পারে।
রাজনৈতিক ও সামরিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায়, মিয়ানমারের এই বিদ্রোহী গোষ্ঠী টিএনএলএ মূলত দেশটির জান্তাবিরোধী জোট ‘থ্রি ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্স’-এর একটি অন্যতম প্রধান শরিক দল। গত ২০২৩ সালের শেষ দিকে উত্তর-পূর্ব মিয়ানমারে রাষ্ট্রীয় সামরিক জান্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে এই জোটটি একটি বড় ধরনের সমন্বিত সামরিক অভিযান শুরু করেছিল। সেই অভিযানের ধারাবাহিকতায় তারা নামখাম এলাকাটি জান্তা বাহিনীর হাত থেকে সম্পূর্ণ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে সক্ষম হয় এবং তখন থেকেই এলাকাটি তাদের শাসনাধীনে রয়েছে।
মন্তব্য