বিধায়কদের অনুপস্থিতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক বাতিল

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে আশানুরূপ ফলাফল না হওয়ার পর সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের (টিএমসি) অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অসন্তোষ ও সাংগঠনিক বিভক্তির স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। রোববার (৩১ মে) কলকাতার কালীঘাটে দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাসভবনে তৃণমূল পরিষদীয় দলের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক আহ্বান করা হয়েছিল। তবে দলের অধিকাংশ বিধায়ক এই সভায় অনুপস্থিত থাকায় শেষ পর্যন্ত বৈঠকটি বাতিল করতে বাধ্য হয় দলীয় নেতৃত্ব। নবগঠিত বিধানসভায় তৃণমূল কংগ্রেসের মোট ৮০ জন বিধায়ক থাকলেও এদিনের বৈঠকে মাত্র ২০ জন উপস্থিত ছিলেন। ফলে প্রয়োজনীয় কোরাম পূরণ না হওয়ায় সভাটি স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

বৈঠক আয়োজনের প্রেক্ষাপট ও অনুপস্থিতি

তৃণমূল পরিষদীয় দলের নেতা ও বালিগঞ্জের বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় এই বিশেষ বৈঠকের আয়োজন করেছিলেন। নির্বাচনের পরবর্তী পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা এবং দলের বিধায়কদের সঙ্গে সমন্বয় আরও জোরদার করার উদ্দেশ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সভার গুরুত্ব বিবেচনা করে তিনি দলের সর্বোচ্চ নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সেখানে উপস্থিত থাকার অনুরোধ জানান এবং সেই অনুযায়ী নেত্রীর কালীঘাটের বাসভবনেই সভার স্থান নির্ধারণ করা হয়।

তবে বৈঠকে দলের মোট ৬০ জন বিধায়কের অনুপস্থিতি পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মহলে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। অনুপস্থিত প্রভাবশালী নেতাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন এন্টালির বিধায়ক সন্দীপন সাহা, কসবার বিধায়ক জাভেদ খান এবং মেটিয়াবুরুজের বিধায়ক আব্দুল খালেক মোল্লা। সাংগঠনিক সূত্র থেকে জানা গেছে, অনুপস্থিত বিধায়কদের কয়েকজনের সঙ্গে দলীয়ভাবে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তা ব্যর্থ হয়েছে। অনেক বিধায়কের মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া গেছে, আবার কেউ কেউ ফোন করলেও তা রিসিভ করেননি।

অন্যদিকে, বৈঠকে উপস্থিত ২০ জন বিধায়কের মধ্যে ছিলেন সাবেক স্পিকার বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়, কামারহাটির বিধায়ক মদন মিত্র, রুকবানুর রহমান, অশোক দেব, গুলশান মল্লিক, আব্দুল রহিম বক্সী ও তোরাফ হোসেন মণ্ডলসহ আরও কয়েকজন নেতা।

দলীয় ব্যাখ্যা ও হামলার ঘটনা

গুরুত্বপূর্ণ এই বৈঠক বাতিলের পর উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেন দলের মুখপাত্র কুণাল ঘোষ। তিনি বিধায়কদের অনুপস্থিতির পেছনে রাজনৈতিক অসন্তোষের দাবি নাকচ করে দিয়ে জানান, দক্ষিণ ২৪ পরগনার সোনারপুরে দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপর হামলার ঘটনার পর রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় পূর্বনির্ধারিত দলীয় কর্মসূচি ও প্রতিবাদ সমাবেশ চলছিল। সেইসব কর্মসূচিতে ব্যস্ত থাকার কারণে অনেক বিধায়ক যথাসময়ে বৈঠকে উপস্থিত হতে পারেননি এবং তাদের অনুরোধের ভিত্তিতেই সভার দিন পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

কুণাল ঘোষ আরও জানান, শুধু অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ই নন, দলের আরেক শীর্ষ নেতা ও সংসদ সদস্য কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপরও হামলার ঘটনা ঘটেছে। এই সমস্ত হামলার ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে আগামী সোমবার পশ্চিমবঙ্গের প্রতিটি ব্লকে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনের জন্য দলীয় নেতা-কর্মীদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপর বিক্ষোভ

তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ এই পরিস্থিতির সূত্রপাত ঘটেছিল গত শনিবার (৩০ মে)। সেদিন দক্ষিণ ২৪ পরগনার সোনারপুর এলাকায় নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত দলীয় পরিবারগুলোর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন তৃণমূলের শীর্ষ নেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সেখানে যাওয়ার পর তিনি স্থানীয় বাসিন্দাদের তীব্র ক্ষোভ ও বিক্ষোভের মুখে পড়েন।

উত্তেজিত জনতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে লক্ষ্য করে অনবরত ডিম ও পাথর নিক্ষেপ করতে থাকে এবং ‘চোর চোর’ স্লোগান দেয়। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকর্মীরা দ্রুত কর্ডন তৈরি করে তাকে নিরাপদে সেখান থেকে সরিয়ে নিয়ে যান। এই ঘটনার পর থেকেই রাজ্য রাজনীতিতে উত্তেজনা বিরাজ করছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ

তৃণমূলের পক্ষ থেকে বৈঠক স্থগিতের বিষয়ে প্রতিবাদ কর্মসূচির যুক্তি দেওয়া হলেও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ ভিন্ন মত পোষণ করছেন। তাদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, যদি আগে থেকেই দলের পক্ষ থেকে বৈঠক স্থগিত বা দিন পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে থাকত, তাহলে ২০ জন বিধায়কের কালীঘাটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাসভবনে উপস্থিত হওয়ার কোনো যৌক্তিক কারণ থাকত না।

বিশ্লেষকদের ধারণা, বিধায়কদের এই ব্যাপক অনুপস্থিতির বিষয়টি নেতৃত্ব আগে থেকে আঁচ করতে পারেনি এবং সভাস্থলে কোরামের তীব্র সংকট দেখা দেওয়ার পরেই পরিস্থিতি সামাল দিতে সভা বাতিলে ঘোষণা দেওয়া হয়। নির্বাচনে পরাজয়ের পরপরই দলীয় প্রধানের ডাকা বৈঠকে বিপুলসংখ্যক বিধায়কের এই অনুপস্থিতি তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ অস্বস্তি, অসন্তোষ ও নেতৃত্বের প্রতি অনাস্থার বহিঃপ্রকাশ বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা।