বিরল স্নায়ুরোগে গর্ভধারণ, রাজশাহীতে সফল প্রসব সম্পন্ন

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে বিরল স্নায়বিক রোগ মায়াস্থেনিয়া গ্রাভিসে আক্রান্ত এক নারী সফলভাবে সন্তান জন্ম দিয়েছেন। দীর্ঘ চিকিৎসা ও বহু বিভাগের সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ৩ মে সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে তিনি কন্যাসন্তানের জন্ম দেন। বর্তমানে মা ও নবজাতক উভয়েই সুস্থ আছেন বলে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন।

তানিয়া খাতুন নামের ওই রোগী গর্ভধারণের খবর জানানোর পর থেকেই রামেক হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) ইনচার্জ আবু হেনা মোস্তফা কামালের তত্ত্বাবধানে ছিলেন। গর্ভধারণের প্রথম মাসেই তিনি বিষয়টি চিকিৎসকদের অবহিত করেন এবং পুরো গর্ভকালজুড়ে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয় তাকে।

তানিয়া খাতুনের স্বামী জেবর আলী জানান, তাদের বিয়ে হয় প্রায় ১০ বছর আগে। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে তানিয়ার শারীরিক জটিলতা শুরু হয়। প্রথমে চোখ লাল হওয়া এবং পরে এক জিনিসকে দুটি দেখা (ডাবল ভিশন) সমস্যায় ভোগেন তিনি। শুরুতে বিষয়টি সাধারণ সমস্যা মনে হলেও পরে অবস্থার অবনতি হলে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা নেওয়া হয় এবং কবিরাজের পরামর্শও গ্রহণ করা হয়। পরবর্তীতে দ্রুত পুঠিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে সেখান থেকে তাকে রামেক হাসপাতালে পাঠানো হয়।

রামেক হাসপাতালে পরীক্ষার পর চিকিৎসকেরা নিশ্চিত হন যে তিনি মায়াস্থেনিয়া গ্রাভিসে আক্রান্ত। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি অটোইমিউন স্নায়বিক রোগ, যেখানে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুলভাবে স্নায়ু ও পেশির সংযোগস্থলে আক্রমণ করে। এর ফলে মস্তিষ্ক থেকে পেশিতে সংকেত সঠিকভাবে পৌঁছাতে পারে না এবং তীব্র পেশিশক্তি দুর্বলতা দেখা দেয়। চিকিৎসকদের মতে, রোগটি সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য না হলেও নিয়ন্ত্রণযোগ্য।

রোগ শনাক্তের পর তানিয়াকে দীর্ঘ সময় আইসিইউতে চিকিৎসাধীন থাকতে হয়। মোট ২১ দিন তিনি আইসিইউতে ছিলেন এবং প্রায় আড়াই মাস হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণ করেন। এ সময় চিকিৎসকেরা পাঁচবার তার রক্তরস পরিবর্তনের (প্লাজমা এক্সচেঞ্জ) চিকিৎসা দেন। এতে রোগীর শরীর থেকে ক্ষতিকর অ্যান্টিবডিযুক্ত প্লাজমা অপসারণ করে নতুন প্লাজমা দেওয়া হয়। ব্যয়বহুল ইমিউনোগ্লোবুলিন ওষুধের বিকল্প হিসেবে এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। হাসপাতালের নিউরো মেডিসিন ও মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপকদের পরামর্শে এই চিকিৎসা প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।

চিকিৎসার পর ধীরে ধীরে তার শারীরিক অবস্থার উন্নতি ঘটে এবং লাইফ সাপোর্ট থেকে তাকে সরিয়ে আনা সম্ভব হয়। পরে তাকে নিউরো ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হয়। তবে চিকিৎসকেরা তাকে সতর্ক করে জানান, ভবিষ্যতে গর্ভধারণ তার জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে এবং সন্তানের জীবনও ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে।

পরবর্তীতে গর্ভধারণ নিশ্চিত হলে পরিবারটি দুশ্চিন্তায় পড়ে যায়। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী তাকে গর্ভকালজুড়ে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। নিউরোলজি, মেডিসিন ও গাইনি বিভাগের চিকিৎসকেরা যৌথভাবে তার চিকিৎসা পরিচালনা করেন।

চিকিৎসক আবু হেনা মোস্তফা কামাল বলেন, জটিল স্নায়বিক রোগে আক্রান্ত অবস্থায় গর্ভধারণ এবং সফল প্রসব অত্যন্ত বিরল ঘটনা। তার মতে, গাইনি, অ্যানেসথেসিয়া, মেডিসিন, নিউরোলজি ও আইসিইউ বিভাগের সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই এই সফলতা অর্জিত হয়েছে।

তানিয়ার স্বামী জেবর আলী জানান, চিকিৎসকেরা শুরুতেই গর্ভধারণকে ঝুঁকিপূর্ণ বলে সতর্ক করেছিলেন এবং সন্তানের জীবনহানির আশঙ্কাও ছিল। তবে তারা গর্ভপাত না করে চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে গর্ভকাল সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত নেন। পুরো সময়জুড়ে নিয়মিত চিকিৎসকদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে নির্দেশনা অনুযায়ী চিকিৎসা গ্রহণ করা হয়।

৩ মে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তানিয়া কন্যাসন্তানের জন্ম দেন। চিকিৎসকদের মতে, ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার মধ্যেও এটি একটি সফল সমন্বিত চিকিৎসা ব্যবস্থার ফল। বর্তমানে মা ও নবজাতক সুস্থ আছেন।

জেবর আলী আরও জানান, নবজাতকের নাম এখনো নির্ধারণ করা হয়নি এবং তিনি চিকিৎসক আবু হেনা মোস্তফা কামালের পরামর্শ অনুযায়ী নাম রাখার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। তাদের আরও একটি আট বছর বয়সী কন্যাসন্তান রয়েছে।

রামেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দীর্ঘমেয়াদি আইসিইউ চিকিৎসা থেকে শুরু করে গর্ভকালীন ব্যবস্থাপনা ও সফল প্রসব—সব ক্ষেত্রেই একাধিক বিভাগের সমন্বিত ভূমিকা ছিল। চিকিৎসকদের মতে, মায়াস্থেনিয়া গ্রাভিসে আক্রান্ত রোগীর সফল গর্ভধারণ ও প্রসব রামেক হাসপাতালের চিকিৎসা ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।