খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ই জুলাই ২০২৬, ৬:১১ পিএম

শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি আপাতত আলোচনার বাইরে রেখে চলমান আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের ছয় সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল ছয় দফা দাবি নিয়ে সচিবালয়ে প্রবেশ করেছে। বুধবার (১৫ জুলাই) বিকেল পৌনে ৫টার দিকে তারা শিক্ষাভবনের সামনে থেকে সচিবালয়ের উদ্দেশে রওনা হন। এর আগে বিকেল ৪টার দিকে শিক্ষাভবনের সামনে পৌঁছালে পুলিশ তাদের অগ্রযাত্রা আটকে দেয়। পরে পরিস্থিতি বিবেচনায় আলোচনার জন্য প্রতিনিধিদলের ছয় সদস্যকে সচিবালয়ে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়।
এই ঘটনাকে আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে। আন্দোলনের শুরুতে শিক্ষার্থীরা তিন দফা দাবির মধ্যে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগকে অন্যতম প্রধান দাবি হিসেবে সামনে আনলেও সচিবালয়ে আলোচনার জন্য জমা দেওয়া দাবিপত্রে সেই বিষয়টি রাখা হয়নি। পরিবর্তে পরীক্ষা, মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং পরীক্ষার্থীদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ছয়টি নির্দিষ্ট দাবি তুলে ধরা হয়। অন্যদিকে সচিবালয়ের বাইরে অবস্থান নেওয়া আন্দোলনকারীদের একটি অংশ তখনও শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে স্লোগান দিতে থাকে। ফলে আলোচনায় অংশ নেওয়া প্রতিনিধিদলের কৌশল এবং মাঠপর্যায়ের আন্দোলনের অবস্থানের মধ্যে একটি স্পষ্ট পার্থক্য চোখে পড়ে।
প্রতিনিধিদলের প্রথম দাবি হলো, দুর্যোগপূর্ণ বা বৈরী পরিস্থিতিতে অনুষ্ঠিত পরীক্ষায় যেসব শিক্ষার্থী মনে করেন তারা স্বাভাবিকভাবে পরীক্ষা দিতে পারেননি, তাদের জন্য পুনরায় পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষার্থীদের মতে, প্রতিকূল পরিবেশে অনেক পরীক্ষার্থী মানসিক চাপ, যাতায়াতের সমস্যা কিংবা নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কারণে তাদের প্রকৃত সক্ষমতার প্রতিফলন ঘটাতে পারেননি। তাই ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য একটি বিকল্প ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
দ্বিতীয় দাবিতে বলা হয়েছে, পুনঃপরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে পূর্বের পরীক্ষার ফলাফল এবং পুনঃপরীক্ষার ফলাফলের মধ্যে যেটি বেশি হবে, সেটিকেই চূড়ান্ত নম্বর হিসেবে গণনা করতে হবে। তাদের যুক্তি, পুনঃপরীক্ষার সুযোগ দেওয়া হলেও যদি কম নম্বর পাওয়ার ঝুঁকি থাকে, তাহলে অনেক শিক্ষার্থী সেই সুযোগ নিতে নিরুৎসাহিত হবেন। উচ্চতর নম্বরকে চূড়ান্ত হিসেবে বিবেচনা করলে শিক্ষার্থীরা ক্ষতির আশঙ্কা ছাড়াই পুনঃপরীক্ষায় অংশ নিতে পারবেন।
তৃতীয় দাবিতে প্রশ্নপত্রে থাকা ভুল বা ত্রুটিপূর্ণ প্রশ্নের জন্য পরীক্ষার্থীদের পূর্ণ নম্বর দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। শিক্ষার্থীদের বক্তব্য, প্রশ্ন প্রণয়নে কোনো ভুল থাকলে তার দায় পরীক্ষার্থীদের ওপর চাপানো উচিত নয়। মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় এই বিষয়টি যথাযথভাবে বিবেচনা করা হলে শিক্ষার্থীরা ন্যায়সংগত ফলাফল পাবেন।
চতুর্থ দাবিতে চলমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে পরীক্ষার্থীদের মানসিক চাপের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনার আহ্বান জানানো হয়েছে। প্রতিনিধিদলের মতে, দীর্ঘ অনিশ্চয়তা, উদ্বেগ এবং চাপের মধ্যে পরীক্ষা দেওয়ার অভিজ্ঞতা শিক্ষার্থীদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তাই প্রয়োজনীয় সময় দিয়ে তাদের স্বাভাবিক মানসিক অবস্থায় ফিরে আসার সুযোগ নিশ্চিত করার পর পুনঃপরীক্ষার সময়সূচি নির্ধারণ করা উচিত।
পঞ্চম দাবিতে অভিযোগ করা হয়েছে, পূর্বঘোষণা ছাড়া প্রশ্নপত্রের ধরনে পরিবর্তন আনা হয়েছে, যা আগের বছরের পরীক্ষা পদ্ধতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। এর ফলে অনেক পরীক্ষার্থী প্রস্তুতির সঙ্গে বাস্তব পরীক্ষার প্রশ্নের ধরন মিলিয়ে নিতে পারেননি। শিক্ষার্থীদের দাবি, মূল্যায়নের সময় এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিতে হবে, যাতে কোনো পরীক্ষার্থী অযৌক্তিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হন।
ষষ্ঠ ও শেষ দাবিতে পরীক্ষাকেন্দ্রে ‘সচেতন গার্ড’-এর নামে কিছু শিক্ষকের অতিরিক্ত কঠোর ও বিভ্রান্তিকর আচরণ বন্ধের আহ্বান জানানো হয়েছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, কিছু কেন্দ্রে অপ্রয়োজনীয় কড়াকড়ি, ঘন ঘন সতর্কবার্তা এবং অস্বস্তিকর পরিবেশ পরীক্ষার্থীদের মনোযোগ নষ্ট করেছে। তাদের মতে, পরীক্ষাকেন্দ্রে শৃঙ্খলা বজায় রাখা যেমন জরুরি, তেমনি পরীক্ষার্থীদের জন্য একটি স্বাভাবিক, নিরাপদ ও চাপমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
শিক্ষার্থীদের উপস্থাপিত ছয় দফা দাবির মূল লক্ষ্য পরীক্ষা গ্রহণ, মূল্যায়ন প্রক্রিয়া এবং পরীক্ষাকেন্দ্রের পরিবেশকে আরও শিক্ষার্থীবান্ধব ও ন্যায়সংগত করা। সচিবালয়ে প্রতিনিধিদলের প্রবেশের মধ্য দিয়ে দাবি-দাওয়াগুলো নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনার পথ খুলেছে। তবে বৈঠক শেষে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সিদ্ধান্ত বা সমঝোতার ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
এদিকে সচিবালয়ের বাইরে অবস্থানরত আন্দোলনকারীরা তাদের কর্মসূচি অব্যাহত রাখেন এবং শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে স্লোগান দিতে থাকেন। ফলে একদিকে সরকারের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সংলাপ, অন্যদিকে মাঠে চলমান আন্দোলন—দুই প্রক্রিয়াই সমান্তরালভাবে এগিয়ে চলেছে। এখন আলোচনার ফলাফল এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের দিকেই শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট সবার নজর।
মন্তব্য