জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ (জিএম) কাদের মন্তব্য করেছেন যে, আওয়ামী লীগের মতো একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলকে বাইরে রেখে দেশে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন করা কঠিন হতে পারে। তাঁর মতে, একটি বড় রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে বিশাল একটি জনগোষ্ঠীকে স্বাভাবিক রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছে। এই বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠীর মৌলিক রাজনৈতিক অধিকার পুনর্বহাল না করা হলে দেশে কাঙ্ক্ষিত স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না।
রাজনৈতিক অধিকার হরণ ও স্থিতিশীলতা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা
আজ সোমবার (১৫ জুন, ২০২৬) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) মিলনায়তনে জাতীয় পার্টি কর্তৃক আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জিএম কাদের এসব কথা বলেন। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সেখানে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে তিনি বিস্তারিত আলোচনা করেন।
জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান বলেন, দেশের এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন টেকসই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। কারণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা না গেলে দেশের অর্থনৈতিক বিনিয়োগের স্থবিরতা কোনোভাবেই দূর করা সম্ভব নয়। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, আওয়ামী লীগ সমর্থকদের রাজনৈতিক অধিকার হরণ করা হলে, তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত করা হলে কিংবা নির্যাতন ও নিপীড়নের মাধ্যমে তাদের দমন করে রাখার চেষ্টা করা হলে, এই বিশাল জনগোষ্ঠী সব সময় তাদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে সক্রিয় থাকার চেষ্টা করবে। এর ফলে দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বারবার বাধাগ্রস্ত হওয়ার তীব্র আশঙ্কা তৈরি হবে। তিনি আরও যোগ করেন, বৃহৎ জনগোষ্ঠীর সামাজিক ও ব্যবসায়িক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না হলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে তাদের অংশগ্রহণ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
প্রস্তাবিত বাজেটের লক্ষ্যমাত্রা ও পরিচালন ব্যয় নিয়ে সমালোচনা
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট প্রসঙ্গে জিএম কাদের বলেন, এবারের বাজেটে সব পক্ষকে খুশি করার একটি আনুষ্ঠানিক চেষ্টা করা হয়েছে। তবে এই বিশাল অঙ্কের বাজেট কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ও বাস্তবসম্মত কোনো দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়নি। প্রস্তাবিত বাজেটে পরিচালন ব্যয় ধরা হয়েছে ৬ লাখ ২১ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা। দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই পরিচালন খরচ কমানোর কোনো সুযোগ নেই, বরং বাস্তবতার নিরিখে এটি আরও বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তিনি উল্লেখ করেন, বাজেটে রাজস্ব আয়ের যে বিশাল লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে তা কোনোভাবেই অর্জন করা সম্ভব না। বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চলমান ইরান যুদ্ধের কারণে সাধারণ মানুষের আর্থিক অবস্থা শোচনীয়। ফলে সাধারণ জনগণের হাতে কর দেওয়ার মতো যথেষ্ট অর্থ এই মুহূর্তে অবশিষ্ট আছে বলে তিনি মনে করেন না।
বাজেট ঘাটতি, ঋণ নির্ভরতা এবং আন্তর্জাতিক সংকটের প্রভাব
জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান বিগত বছরগুলোর অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলেন, অতীতে দেশের ইতিহাসে কখনই ৭৭ শতাংশের বেশি রাজস্ব আদায় করা সম্ভব হয়নি। বর্তমান দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনায় নিলে এবার রাজস্ব আহরণের হার আগের চেয়ে আরও কমে যাবে। তাঁর ব্যক্তিগত হিসাব ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এবারের বাজেটে প্রকৃত ঘাটতির আকার দাঁড়াবে প্রায় ৪ লাখ ৬৬ হাজার কোটি টাকা। এই বিশাল ঘাটতি মেটাতে এবং পরিচালন ব্যয় সচল রাখতে সরকারকে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উৎস থেকে অন্তত ২ লাখ ২৯ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিতে হবে।
তিনি এই বাজেটকে অতিরিক্ত ঋণ নির্ভর বাজেট হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, সার্বিক বিবেচনায় এটি পুরোপুরি বাস্তবায়নযোগ্য নয়। বাজেট বাস্তবায়নের এই বড় ধরনের ব্যত্যয়সমূহ পরবর্তীতে দেশের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক সংকটকে আরও বেশি ঘনীভূত করার আশঙ্কা তৈরি করবে। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে জিএম কাদের বলেন, ইরান যুদ্ধের কারণে সারা বিশ্বে একটি বড় ধরনের অর্থনৈতিক মন্দা নেমে আসতে পারে বলে শঙ্কা করা হচ্ছে। অথচ দেশের প্রস্তাবিত বাজেটে সেই বৈশ্বিক সংকটের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে বলে মনে হয়নি। তিনি সংকট উত্তরণে সরকারকে সবাইকে নিয়ে পথচলার আহ্বান জানান এবং বলেন, সুদৃঢ় রাজনৈতিক ঐক্যমত ছাড়া এই বাজেট বাস্তবায়ন করা অসম্ভব।
উক্ত সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন জাতীয় পার্টির মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী, প্রেসিডিয়াম সদস্য ফখরুল ইমাম এবং হাজী সাইফুদ্দীন আহমেদ মিলনসহ দলের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ।
