চট্টগ্রাম মহানগরীর বায়েজিদ বোস্তামী থানা এলাকায় পূর্বপরিকল্পিত এক হামলায় মোহাম্মদ হাসান ওরফে রাজু (২৫) নামের এক যুবককে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রাথমিক তদন্ত ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রাউজান উপজেলার আলোচিত যুবদলকর্মী নাসির উদ্দিন হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ নিতেই এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাত ১০টার দিকে রৌফাবাদের শহীদ মিনার কলোনি এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
Table of Contents
হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপট ও বিবরণ
নিহত রাজু রাউজান উপজেলার কদলপুর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ শমসেরপাড়া এলাকার আবুল কালামের ছেলে। তিনি গত ২৬ এপ্রিল রাউজানে সংঘটিত যুবদলকর্মী নাসির উদ্দিন হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি ছিলেন। নাসির উদ্দিন বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরীর অনুসারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
ঘটনার দিন রাজু কদলপুর থেকে নগরীর রৌফাবাদ এলাকায় তাঁর বোনের বাড়িতে বেড়াতে এসেছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শী ও সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে জানা যায়, রাত সাড়ে ৯টার দিকে রাতের খাবার শেষ করে বোনের বাসায় অবস্থানকালে রাজুর মোবাইলে একটি ফোন আসে। সেই ফোনের সূত্র ধরে তিনি বাসা থেকে বের হয়ে গলির মুখে আসতেই আগে থেকে ওত পেতে থাকা ৩-৪ জন মুখোশধারী সন্ত্রাসী তাঁকে লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ শুরু করে।
সিসিটিভি ফুটেজ ও হামলার ধরণ
ঘটনাস্থল থেকে সংগৃহীত সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, হামলাকারীরা অত্যন্ত দ্রুততার সাথে তাদের মিশন সম্পন্ন করে। মাত্র এক মিনিটের মধ্যে পুরো প্রক্রিয়া শেষ করে তারা পালিয়ে যায়। ফুটেজে দেখা যায়, সন্ত্রাসীরা দৌড়ানো অবস্থায় মাত্র ৬ সেকেন্ডের ব্যবধানে ৪ রাউন্ড গুলি ছুড়েছে। খুব কাছ থেকে গুলি করার কারণে রাজুর শরীরে একাধিক গুলি বিদ্ধ হয় এবং ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়। এ সময় রেশমি আক্তার নামে ১১ বছর বয়সী এক শিশুও গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হয়। বর্তমানে সে আশঙ্কাজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছে।
ঘটনার সংক্ষিপ্ত সারসংক্ষেপ
| বিষয় | তথ্য |
| নিহতের নাম | মোহাম্মদ হাসান ওরফে রাজু |
| ঘটনার সময় | বৃহস্পতিবার রাত ১০:০০ ঘটিকা |
| ঘটনাস্থল | শহীদ মিনার কলোনি, রৌফাবাদ, বায়েজিদ বোস্তামী, চট্টগ্রাম |
| আহতের নাম | রেশমি আক্তার (১১ বছর) |
| হামলাকারীর সংখ্যা | ৩ থেকে ৪ জন (মুখোশধারী) |
| গুলি বর্ষণের সময়কাল | ৬ সেকেন্ডে ৪ রাউন্ড |
| হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য কারণ | যুবদলকর্মী নাসির হত্যার প্রতিশোধ (পূর্বশত্রুতা) |
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বক্তব্য ও তদন্ত
ঘটনার পর থেকে রৌফাবাদ এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। বায়েজিদ বোস্তামী থানা পুলিশ, মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) এবং র্যাবের গোয়েন্দা ইউনিট তদন্ত শুরু করেছে। পুলিশ ঘটনাস্থল ও আশপাশের একাধিক সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করে হামলাকারীদের শনাক্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছে।
সিএমপি (উত্তর) বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) আমিরুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানান, রাউজান উপজেলার রাজনৈতিক ও অপরাধমূলক বিরোধের রেশ চট্টগ্রাম মহানগর এলাকায় এসে পৌঁছেছে। এই হত্যাকাণ্ডটি যে পূর্বপরিকল্পিত, তা প্রাথমিক তদন্তে স্পষ্ট। অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে।
পরিবারের দাবি ও রাউজানের পরিস্থিতি
নিহত রাজুর যমজ ভাই মোহাম্মদ হোসেন সাজু দাবি করেছেন যে, রাজু কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না এবং তিনি শহরে দিনমজুরের কাজ করতেন। নাসির হত্যা মামলায় রাজুকে ভুলভাবে আসামি করা হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন। শুক্রবার বিকেলে ময়নাতদন্ত শেষে রাজুর মরদেহ তাঁর গ্রামের বাড়ি রাউজানে নিয়ে যাওয়া হয়।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাউজান এলাকায় সহিংসতা ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ২২ মাসে রাউজান সংশ্লিষ্ট এলাকায় অন্তত ২৩টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে ১৬টি রাজনৈতিক কারণে সংঘটিত হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। রাজু হত্যাকাণ্ড সেই ধারাবাহিকতারই অংশ বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত এই ঘটনায় থানায় কোনো আনুষ্ঠানিক মামলা দায়ের করা হয়নি, তবে নিহতের পরিবার মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
