গত বছরের অক্টোবরের মধ্যভাগে এক স্বাভাবিক সকালই বদলে দেয় চলচ্চিত্র নির্মাতা শাহনেওয়াজ কাকলী ও তাঁর পরিবারের জীবন। হঠাৎ শরীরের উপসর্গ—হাত-পা ঝিমঝিম, খেতে অস্বস্তি—বাড়তে থাকলে পরিবার তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যান। পরীক্ষা–নিরীক্ষার পর চিকিৎসক নিশ্চিত করেন, তিনি স্ট্রোক করেছেন।
প্রথমে দুটি হাসপাতালে টানা এক সপ্তাহ চিকিৎসা চলেছিল, এরপর বাসায় পুনর্বাসন শুরু। তবে সুস্থতার পথ ছিল দীর্ঘ ও ধীরে। কয়েক সপ্তাহ পর ঢাকার মিরপুরের সিআরপি (পক্ষাঘাতগ্রস্তদের পুনর্বাসন কেন্দ্র) এ নিয়মিত থেরাপি শুরু হয়। শুরুতে দুই মাস ভর্তি থেকে থেরাপি, এরপর এক মাস বাসায় চিকিৎসা, তারপর আবার এক মাস সিআরপিতে ভর্তি। প্রতিদিন তিনটি থেরাপি—ফিজিওথেরাপি, অকুপেশনাল থেরাপি ও স্পিচ থেরাপি—এখন তাঁর দৈনন্দিন জীবন।
প্রতিদিনের থেরাপি এবং অন্যান্য চিকিৎসা খরচ প্রায় ৮,০০০–১০,০০০ টাকা। চার মাসে এই খরচে পরিবারের জমানো টাকা প্রায় শেষ। অভিনেতা প্রাণ রায় জানালেন, “আমাদের ‘ফ্রম বাংলাদেশ’ সিনেমার জন্য জমা টাকা চিকিৎসায় ব্যবহার হচ্ছে। শখের গাড়িও বিক্রি করেছি। হাসপাতাল ও বাসার খরচ মিলিয়ে জীবন খুব কঠিন হয়ে গেছে।”
চার বছর আগে কেনা গাড়িটি ছিল কাকলী ও প্রানের প্রিয়, শুটিং, লোকেশন ভ্রমণ এবং পারিবারিক যাত্রার স্মৃতি বহনকারী। চিকিৎসার কারণে তা বিক্রি করা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। পাশাপাশি, প্রাণ রায়ও চার মাস শুটিং করতে পারেননি, তাই আয়রোজগারও থমকে গেছে।
শাহনেওয়াজ কাকলী বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে সংবেদনশীল ও মানবিক গল্পকার হিসেবে পরিচিত। তাঁর প্রথম ছবি ‘জলরং’ মুক্তি না পেলেও ‘উত্তরের সুর’ (২০১২) তাঁকে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে এনে দেয়। ২০১৫ সালে মুক্তি পাওয়া ‘নদীজন’ ছবিটিও জাতীয় পুরস্কার অর্জন করে। কাকলীর গল্পে ছিল নদী, মানুষ, জীবনসংগ্রামের মাটির গন্ধ এবং প্রান্তিক মানুষের কাহিনী।
নিচের টেবিলে দেখানো হলো কাকলীর চলচ্চিত্রের কিছু উল্লেখযোগ্য তথ্য:
| ছবি | মুক্তি সাল | জাতীয় পুরস্কার | আন্তর্জাতিক পরিচিতি |
|---|---|---|---|
| উত্তরের সুর | ২০১২ | সেরা ছবি, পার্শ্ব অভিনেত্রী, শিশুশিল্পী | বিভিন্ন উৎসবে প্রদর্শিত |
| নদীজন | ২০১৫ | জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার | প্রশংসিত |
| ফ্রম বাংলাদেশ | ২০২২ (শুটিং) | – | মুক্তি প্রক্রিয়াধীন |
নির্মাতা নিজেও নিয়মিত টেলিভিশন নাটক ও চিত্রনাট্য কাজ করতেন। ২০২২ সালে শুরু করা ‘ফ্রম বাংলাদেশ’ শুটিং ও পোস্ট-প্রোডাকশন প্রায় শেষ, তবে অসুস্থতার কারণে মুক্তি থেমে আছে।
প্রাণ রায় জানান, “উন্নতি ধীরে হলেও আছে। আগে স্ট্রেচারে আনতাম, এখন হুইলচেয়ারে। দুই পাশে দুজন ধরলে ১০–১২ পা এগোতে পারে। বাঁ হাত-পা এখনো নড়াতে পারে না। কথা বলতে পারে, কিন্তু মুখ বেঁকে যায়।”
শাহনেওয়াজ কাকলীর এই সংগ্রাম শুধু ব্যক্তিগত নয়, চলচ্চিত্র ও সাংস্কৃতিক জগতেরও দুঃখজনক অধ্যায়। যে মানুষটি পর্দায় আলো জ্বালাতেন, আজ তাঁর ঘরেই আলো জ্বালিয়ে রাখার সংগ্রাম চলছে। তবু আশার রঙ আছে, কারণ শিল্পীরা সহজে হার মানেন না। হয়তো একদিন আবার তিনি ক্যামেরার পেছনে দাঁড়িয়ে বলবেন, “অ্যাকশন, কাট।”
শারীরিক অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই, দৈনন্দিন ব্যথা, আর আর্থিক চাপ—এই তিনটি মিলিয়ে কাকলী ও তাঁর পরিবার এখন কঠিন সময়ে আছে। তবু পরিবার ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের সহায়তায় চিকিৎসা চলমান, এবং আশার আলো এখনও জীবনের সঙ্গে জ্বলছে।
