খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৪ই মার্চ ২০২৬, ৬:১১ এএম

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে চরম উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালী। সম্প্রতি ইরানের ড্রোন হামলার কবলে পড়ার হাত থেকে অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) একটি জাহাজ। এই ঘটনার পর নিরাপত্তার স্বার্থে হরমুজ প্রণালী ও এর আশপাশের জলসীমায় অবস্থানরত চারটি বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজের যাত্রা নিয়ে বিশেষ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। বর্তমানে এই জাহাজগুলো ও এর নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
Table of Contents
গত শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলী বন্দরে নোঙর করা অবস্থায় বাংলাদেশি জাহাজ এমভি বাংলার জয়যাত্রা ইরানের একটি ড্রোনের লক্ষ্যবস্তুর খুব কাছে পড়ে যায়। জাহাজে থাকা নাবিক আতিকুল হকের বর্ণনামতে, তাদের জাহাজ থেকে মাত্র ১০০ গজ দূরে একটি শক্তিশালী ড্রোন বিস্ফোরিত হয়। ড্রোনটির তীব্র আলো এবং বিস্ফোরণের প্রচণ্ড শব্দে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন জাহাজে থাকা ৩১ জন নাবিক। ভাগ্যক্রমে জাহাজটি সরাসরি আঘাতপ্রাপ্ত না হওয়ায় নাবিকরা অক্ষত আছেন।
গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ৩৮ হাজার ৮০০ টন স্টিল কয়েল নিয়ে কাতার থেকে জেবেল আলী বন্দরে পৌঁছায় জাহাজটি। হামলার পর বন্দরে ‘রেড অ্যালার্ট’ জারি করা হলে পণ্য খালাস সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়। যদিও দুই দিন পর পুনরায় কাজ শুরু হয়েছে, তবে বর্তমান যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির কারণে জাহাজটি এখনই হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করে নিরাপদ জলসীমায় ফিরে আসতে পারছে না।
বর্তমানে চারটি বাংলাদেশি বাণিজ্যিক জাহাজ এই স্পর্শকাতর অঞ্চলে অবস্থান করছে। তাদের নিরাপত্তা সংক্রান্ত তথ্য নিচের সারণিতে তুলে ধরা হলো:
| জাহাজের নাম | মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান | বর্তমান অবস্থান/গন্তব্য | বর্তমান অবস্থা |
| বাংলার জয়যাত্রা | বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন | জেবেল আলী বন্দর, ইউএই | পণ্য খালাস শেষ, তবে যাত্রা স্থগিত। |
| এমভি মেঘনা (ছদ্মনাম) | মেঘনা গ্রুপ (MGI) | আরব সাগর | জ্বালানি নিতে শারজাহ যাওয়ার কথা থাকলেও যাত্রা স্থগিত। |
| কেএসআরএম জাহাজ ১ | কেএসআরএম গ্রুপ | ওমানের সালালা বন্দরগামী | গতি কমিয়ে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থানের নির্দেশ। |
| কেএসআরএম জাহাজ ২ | কেএসআরএম গ্রুপ | কুয়েতগামী | গতি কমিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। |
কেএসআরএম গ্রুপের নির্বাহী পরিচালক মেহেরুল করিম জানান, তাদের দুটি জাহাজ তিন-চার দিনের মধ্যে গন্তব্যে পৌঁছানোর কথা ছিল। তবে নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে তাদের গতি ধীর করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে মেঘনা গ্রুপের মালিকানাধীন মার্কেন্টাইল শিপিং লাইনসের একটি জাহাজ সংযুক্ত আরব আমিরাতের খোর ফাক্কান বন্দরে জ্বালানি সংগ্রহের কথা থাকলেও তা স্থগিত রাখা হয়েছে। জাহাজটি বর্তমানে আরব সাগরের অপেক্ষাকৃত নিরাপদ অংশে ভাসমান অবস্থায় রয়েছে।
বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন এবং সংশ্লিষ্ট শিপিং লাইনগুলো প্রতিনিয়ত স্যাটেলাইট ফোনের মাধ্যমে জাহাজের ক্যাপ্টেনদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। হরমুজ প্রণালী বর্তমানে ‘অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ’ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক নৌ-সংস্থাগুলোর পরামর্শ অনুযায়ী বাংলাদেশি জাহাজগুলোকে কিছু বিশেষ বিধিনিষেধ মেনে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে:
রাতে চলাচলের সময় জাহাজের বহিঃস্থ আলো নিয়ন্ত্রণ করা।
আইএসএস (Identification System) চালু রেখে সার্বক্ষণিক অবস্থান জানানো।
জরুরি সংকেত পাওয়ার সাথে সাথে নিরাপদ স্থানে নোঙর করা।
বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। ইরান ও পশ্চিমা শক্তির মধ্যকার এই ছায়াযুদ্ধ সমুদ্রপথে যাতায়াতকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর জন্য যমদূত হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশি নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সমন্বিতভাবে কাজ করছে। বাংলার জয়যাত্রার নাবিকরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হলেও বর্তমানে তারা নিরাপদ আছেন বলে নিশ্চিত করা হয়েছে।
মন্তব্য