বীমা কোম্পানির নিবন্ধন ফি বৃদ্ধিতে আইনি জটিলতা ও বিতর্ক

দেশের বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) এবং বীমা কোম্পানিগুলোর মধ্যে ‘নিবন্ধন নবায়ন ফি’ বৃদ্ধি নিয়ে তীব্র বিরোধ ও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। সম্প্রতি জারিকৃত সংশোধিত বিধিমালার দোহাই দিয়ে ২০২৬ সালের জন্য অতিরিক্ত ফি দাবি করছে আইডিআরএ, যাকে বীমা সংশ্লিষ্টরা ‘আইনবহির্ভূত’ এবং ‘অযৌক্তিক’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। বীমা আইন-২০১০ এবং প্রচলিত বিধিবিধান লঙ্ঘন করে এই ফি আদায়ের চেষ্টা খাতের স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।


বিরোধের মূল কারণ ও প্রেক্ষাপট

২০২৪ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি সরকার ‘বীমা ব্যবসা নিবন্ধন ফি বিধিমালা- ২০১২’ সংশোধন করে একটি গেজেট প্রকাশ করে। এই নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, বীমা কোম্পানিগুলোর নিবন্ধন নবায়ন ফি কয়েক গুণ বৃদ্ধি করা হয়েছে। আইডিআরএ গত ১৯ ফেব্রুয়ারি এক নির্দেশনায় কোম্পানিগুলোকে এই বর্ধিত হারের অবশিষ্ট অর্থ পরিশোধের নির্দেশ দেয়।

তবে মূল জটিলতা তৈরি হয়েছে ফি পরিশোধের সময়সীমা নিয়ে। বীমা আইন ২০১০ অনুযায়ী, একটি কোম্পানিকে ২০২৬ সালের ব্যবসা পরিচালনার জন্য পূর্ববর্তী বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বরের মধ্যেই নির্ধারিত ফি জমা দিতে হয়। বীমা কোম্পানিগুলো ইতোমধ্যে আগের হার (প্রতি হাজারে ১ টাকা) অনুযায়ী ফি পরিশোধ করে নবায়নের আবেদন সম্পন্ন করেছে। এখন ফেব্রুয়ারিতে এসে পুনরায় অতিরিক্ত অর্থ দাবি করাকে নিয়ন্ত্রক সংস্থার ‘স্বেচ্ছাচারিতা’ হিসেবে দেখছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।

সংশোধিত নিবন্ধন ফি’র তুলনামূলক চিত্র

সংশোধিত বিধিমালা অনুযায়ী আগামী বছরগুলোতে গ্রস প্রিমিয়ামের ওপর ফি’র হার যেভাবে বৃদ্ধি পাবে:

সময়কালপ্রতি হাজার গ্রস প্রিমিয়ামে ফি (টাকা)পূর্ববর্তী হার (টাকা)বৃদ্ধির হার
২০২৬ – ২০২৮২.৫০১.০০১৫০%
২০২৯ – ২০৩১৪.০০১.০০৩০০%
২০৩২ ও পরবর্তী৫.০০১.০০৪০০%

আইনি অসংগতি ও বিশেষজ্ঞ মতামত

বীমা বিশেষজ্ঞদের মতে, বীমা আইন-২০১০ বা আইডিআরএ আইনে ‘ভুতাপেক্ষা’ (Retrospective) প্রভাবে ফি আদায়ের কোনো এখতিয়ার নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে দেওয়া হয়নি। অর্থাৎ, যে ফি’র লেনদেন বা দায়বদ্ধতা গত নভেম্বরে শেষ হয়ে গেছে, ফেব্রুয়ারি মাসে আইন সংশোধন করে সেই পুরনো দায়ের ওপর অতিরিক্ত চার্জ আরোপ করা আইনিভাবে টেকসই নয়।

বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ফোরামের (বিআইএফ) সেক্রেটারি জেনারেল ও সেনা ইন্স্যুরেন্সের সিইও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. শফিক শামীম পিএসসি (অব.) বলেন, “২০২৬ সালের নিবন্ধন নবায়নের জন্য আমরা ইতোমধ্যে আগের বিধি অনুযায়ী ফি জমা দিয়েছি। এখন হঠাৎ করে বাড়তি ফি দাবি করা হলে তা কোম্পানিগুলোর আর্থিক ভারসাম্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এই বর্ধিত হার ২০২৭ সাল থেকে কার্যকর করা হলে কোম্পানিগুলো প্রস্তুতির সুযোগ পেত।”

একই সুরে কথা বলেছেন জেনিথ ইসলামী লাইফের মুখ্য নির্বাহী এস এম নুরুজ্জামান এবং এশিয়া ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী ইমাম শাহীন। তারা মনে করেন, নভেম্বরে পরিশোধিত অর্থ ২০২৫ সালের খরচ হিসেবে হিসাবভুক্ত হয়ে গেছে। এখন নতুন করে ফি দাবি করা মানে হলো কোম্পানির গত বছরের আর্থিক বিবরণীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা।

নেপথ্যের কারণ ও বির্তকিত ‘দুয়ার সার্ভিস’

অভিযোগ উঠেছে, ২০২৪ সালের জুলাই পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ‘দুয়ার সার্ভিস লিমিটেড’ নামক একটি বিতর্কিত প্রতিষ্ঠানের এসএমএস সেবার বিল পরিশোধ নিয়ে বীমা কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আইডিআরএ-র বিরোধ শুরু হয়। কোম্পানিগুলো এই বিল দিতে অস্বীকৃতি জানালে, সেই ঘাটতি পোষাতে নিবন্ধন ফি ৫ গুণ পর্যন্ত বাড়ানোর আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নেয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা। এমনকি বর্ধিত ফি না দিলে নিবন্ধন সনদ আটকে রাখার মতো গুরুতর হুমকিও দেওয়া হচ্ছে বলে অনেক সিইও অভিযোগ করেছেন।

উপসংহার

বীমা খাতের অভিভাবক হিসেবে আইডিআরএ-র কাজ হলো খাতকে সুশৃঙ্খল করা, কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া নয়। আইনের মারপ্যাঁচে ফেলে কোম্পানিগুলোকে অতিরিক্ত ফি দিতে বাধ্য করা হলে তা বিনিয়োগকারী ও গ্রাহক—উভয় পক্ষের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ করবে। বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন (বিআইএ) দ্রুত এই সমস্যার সমাধানে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার তাগিদ দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত কোম্পানিগুলো এই ‘আইনবহির্ভূত’ দাবি মেনে নেবে নাকি আদালতের দ্বারস্থ হবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।