খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৯ই জুলাই ২০২৬, ৪:৬ পিএম

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এমন কিছু স্রষ্টা আছেন, যাঁদের সৃষ্টি সময়ের গণ্ডি অতিক্রম করে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে আলো দিয়ে যায়। হুমায়ূন আহমেদ সেই বিরল কৃতীদের একজন। তিনি শুধু একজন জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক ছিলেন না; তিনি ছিলেন এক অনন্য গল্পকার, নাট্যকার, চলচ্চিত্র নির্মাতা এবং কোটি মানুষের অনুভূতির ভাষ্যকার। তাঁর লেখা যেমন পাঠককে হাসিয়েছে, তেমনি কাঁদিয়েছে; স্বপ্ন দেখিয়েছে, আবার জীবনের গভীর বাস্তবতার মুখোমুখিও দাঁড় করিয়েছে।
আজ ১৯ জুলাই। বাংলা সাহিত্যপ্রেমীদের জন্য এটি এক বেদনাবিধুর দিন। ২০১২ সালের এই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের বেলভিউ হাসপাতালে ক্যান্সারের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াই শেষে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর শারীরিক বিদায় ঘটলেও সাহিত্য, সংস্কৃতি ও মানুষের হৃদয় থেকে তিনি কখনো বিদায় নেননি। তাঁর সৃষ্টি আজও সমানভাবে পাঠকের কাছে প্রাসঙ্গিক, প্রাণবন্ত এবং আবেগময়।
হুমায়ূন আহমেদের চরিত্রগুলো যেন বাস্তব জীবনের মানুষ। হলুদ পাঞ্জাবি পরা হিমু এখনও কল্পনার শহরে উদ্দেশ্যহীন হেঁটে বেড়ায়। যুক্তিবাদী মিসির আলি মানুষের মনস্তত্ত্ব ও রহস্যের অন্ধকারে আলো খুঁজে ফেরেন। রূপার নীরব ভালোবাসা, শুভ্রর নির্মল ব্যক্তিত্ব, বাকের ভাইয়ের প্রতিবাদী চেতনা কিংবা নন্দিত নরকে, কোথাও কেউ নেই, শঙ্খনীল কারাগার ও কৃষ্ণপক্ষ—এসব সৃষ্টি আজও বাংলা সাহিত্যের পাঠকদের কাছে সমান জনপ্রিয়।
Table of Contents
জীবনের শেষ সময়ে চিকিৎসার জন্য তিনি নিউইয়র্কে অবস্থান করছিলেন। হাসপাতালের জানালার বাইরে ছিল বরফে ঢাকা নগরী। অথচ তাঁর মন পড়ে ছিল বাংলার প্রকৃতিতে। কাছের একজনকে তিনি বলেছিলেন, এই বরফ তাঁর ভালো লাগে না; তাঁর মনে হয়, ঠিক এই মুহূর্তে নুহাশ পল্লীতে ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে, গাছের পাতায় টুপটাপ জল পড়ছে, চারদিকে ব্যাঙের ডাক শোনা যাচ্ছে। সেই বৃষ্টিতে আর কোনোদিন ভিজতে পারবেন কি না—এই প্রশ্নই যেন তাঁর হৃদয়ের গভীর আকুলতার প্রকাশ।
এই অনুভূতির মধ্যেই ধরা পড়ে তাঁর শেকড়ের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা। বাংলার গ্রাম, বর্ষা, নদী, গাছপালা এবং প্রকৃতির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল আত্মার সম্পর্ক। সেই কারণেই তাঁর সাহিত্যেও প্রকৃতি কখনো নিছক পটভূমি নয়; বরং জীবন্ত এক চরিত্র।
তিনি দেশে ফিরেছিলেন, তবে জীবনের উচ্ছ্বাস নিয়ে নয়; ফিরেছিলেন নিথর দেহে। তাঁরই স্বপ্নের ঠিকানা গাজীপুরের নুহাশ পল্লীর লিচুতলায় তাঁকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়। আজও মনে হয়, বর্ষার প্রতিটি বৃষ্টিধারা নীরবে তাঁর সমাধিকে ছুঁয়ে যায়। পূর্ণিমার জোছনা যেন এসে বসে তাঁর শিয়রে, আর চারপাশের গাছপালা তাঁর গল্পের চরিত্রগুলোর মতো নীরবে কথা বলে।
১৯৭২ সালে প্রকাশিত নন্দিত নরকে উপন্যাসের মাধ্যমে সাহিত্যাঙ্গনে তাঁর অভিষেক ঘটে। এরপর চার শতাধিক গ্রন্থ, অসংখ্য কালজয়ী নাটক, জনপ্রিয় টেলিভিশন ধারাবাহিক এবং চলচ্চিত্র নির্মাণের মধ্য দিয়ে তিনি বাংলা ভাষার সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখকদের কাতারে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।
তাঁর অসামান্য সাহিত্যকীর্তির স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, একুশে পদক এবং স্বাধীনতা পুরস্কারসহ দেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় ও সাহিত্যিক সম্মানে ভূষিত হন। তবে তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল সাধারণ মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নেওয়া। সহজ, সাবলীল অথচ গভীর ভাষায় তিনি প্রেম, পরিবার, মানবিকতা, মুক্তিযুদ্ধ, বিজ্ঞানমনস্কতা, একাকীত্ব এবং জীবনের সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলোকে এমনভাবে তুলে ধরেছেন, যা সব বয়সের পাঠককে সমানভাবে স্পর্শ করে।
হুমায়ূন আহমেদের লেখায় নিঃসঙ্গতা কখনো বিষণ্নতার প্রতীক হয়ে ওঠেনি; বরং তা হয়ে উঠেছে আত্মঅন্বেষণের এক নির্মল আশ্রয়। বৃষ্টির শব্দ, জোছনার আলো, নদীর ঢেউ কিংবা নির্জন দুপুর—সবকিছুর মধ্যেই তিনি জীবনের সৌন্দর্য খুঁজে পেয়েছেন এবং পাঠকদেরও সেই সৌন্দর্য অনুভব করতে শিখিয়েছেন।
সত্যিকারের স্রষ্টার মৃত্যু হয় না। যতদিন বাংলা ভাষা বেঁচে থাকবে, ততদিন হিমু পথ চলবে, মিসির আলি রহস্যের জট খুলবেন, রূপা অপেক্ষা করবে, আর নুহাশ পল্লীর আকাশে বর্ষার বৃষ্টি নেমে আসবে।
প্রয়াণ দিবসে বাংলা সাহিত্যের এই চিরসবুজ কথাশিল্পীর প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা, অফুরন্ত ভালোবাসা এবং অনন্ত কৃতজ্ঞতা। আপনি নেই, তবু আছেন—প্রতিটি বৃষ্টিভেজা বিকেলে, প্রতিটি জোছনামাখা রাতে, প্রতিটি বইয়ের পাতায় এবং প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ের গভীরে।
শ্রদ্ধাঞ্জলি, হুমায়ূন আহমেদ।
মন্তব্য