খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৯ই জুলাই ২০২৬, ৩:৩ পিএম

মুন্সীগঞ্জের টঙ্গীবাড়ীতে পারিবারিক কলহের জেরে স্ত্রীকে হত্যার অভিযোগে এক মসজিদের ইমামকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তদন্তকারীদের দাবি, হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনাটি আত্মহত্যা হিসেবে প্রচার করার উদ্দেশ্যে মরদেহ ঝুলিয়ে রাখার চেষ্টা করেছিলেন অভিযুক্ত। সেই পরিকল্পনা সফল না হওয়ায় চার বছরের কন্যাসন্তানকে সঙ্গে নিয়ে তিনি এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যান। তবে তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত ও গোয়েন্দা তৎপরতার মাধ্যমে ঘটনার প্রায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই তাঁকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়।
নিহত আয়েশা আক্তার (২৮) মুন্সীগঞ্জের টঙ্গীবাড়ী উপজেলার বালিগাঁও ইউনিয়নের পূর্ব বালিগাঁও গ্রামের বাসিন্দা। গ্রেপ্তার হওয়া মো. মুহাসিন মাতুব্বর (৩২) একই গ্রামের একটি জামে মসজিদের ইমাম। তাঁর গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার বাহারা গ্রামে। দম্পতির চার বছর বয়সী একটি কন্যাসন্তান রয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী তাদের বিয়ে হয়েছিল এবং প্রায় ছয় মাস ধরে তারা পূর্ব বালিগাঁও এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করছিলেন। তদন্তে প্রাথমিকভাবে উঠে এসেছে, স্ত্রীর আগের দুটি বিয়ে নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিরোধ চলছিল। বিষয়টি কেন্দ্র করে প্রায়ই তাদের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক ও পারিবারিক অশান্তি সৃষ্টি হতো।
পিবিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার আগের দিন ৫ জুলাই এশার নামাজ শেষে বাসায় ফিরে স্ত্রীকে একটি পুরোনো পোশাক পরা অবস্থায় দেখে ক্ষুব্ধ হন মুহাসিন। এ নিয়ে দুজনের মধ্যে কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। একপর্যায়ে তিনি স্ত্রীকে মারধর করেন এবং তাঁর পরনের পোশাক ছিঁড়ে ফেলেন বলে তদন্তে জানা গেছে।
পরদিন ৬ জুলাই সকালে নাশতা প্রস্তুত না থাকার কারণ জানতে চাইলে আয়েশা জানান, তাঁর মাথাব্যথা করছে। এই কথাকে কেন্দ্র করেই আবার নতুন করে বিরোধ শুরু হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই সময় মুহাসিন স্ত্রীর আগের বিয়ে নিয়ে কটূক্তি করতে থাকেন এবং শারীরিকভাবে নির্যাতন করেন। একপর্যায়ে তিনি স্ত্রীর গলা চেপে ধরে দেয়ালের দিকে ধাক্কা দেন। এতে দেয়ালের কাঠের পাটাতনে মাথা ও শরীরে গুরুতর আঘাত লাগে। ঘটনাস্থলেই আয়েশার মৃত্যু হয় বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।
হত্যাকাণ্ডের পর নিজের অপরাধ আড়াল করার চেষ্টা করেন অভিযুক্ত। পিবিআই জানায়, তিনি মরদেহের গলায় ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যার ঘটনা বলে প্রতীয়মান করার জন্য ঝুলিয়ে রাখার চেষ্টা করেন। কিন্তু সেই চেষ্টা সফল হয়নি। পরে মরদেহ খাটের ওপর ফেলে রেখে চার বছরের মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে দ্রুত এলাকা ত্যাগ করেন।
ঘটনার পর নিহতের ভাই মো. শামীম তালুকদার টঙ্গীবাড়ী থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্তের দায়িত্ব নেয় পিবিআই মুন্সীগঞ্জ। তদন্তকারীরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন, আলামত সংগ্রহ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় অভিযুক্তের গতিবিধি বিশ্লেষণ করেন। বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ৮ জুলাই তাঁর অবস্থান শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে আদালতের মাধ্যমে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা রনি দেবনাথ জানান, গ্রেপ্তারের পর অভিযুক্তকে আদালতে হাজির করা হলে তিনি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। ওই জবানবন্দিতে স্ত্রীকে হত্যার বিষয়টি তিনি স্বীকার করেছেন বলে তদন্তকারী কর্মকর্তা জানিয়েছেন। আদালতে দেওয়া এমন জবানবন্দি মামলার বিচারিক প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচিত হলেও অন্যান্য সাক্ষ্য-প্রমাণ ও ফরেনসিক তথ্যের সঙ্গেও তা যাচাই করা হবে।
পিবিআইয়ের মুন্সীগঞ্জ জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আয়েশা আরা জাহান বলেন, প্রাথমিক তদন্তে পারিবারিক কলহই এই হত্যাকাণ্ডের প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। তবে কোনো দিকই উপেক্ষা করা হচ্ছে না। ঘটনার প্রতিটি বিষয় খুঁটিয়ে দেখা হচ্ছে এবং তদন্ত শেষ হলে আদালতে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা মনে করেন, পারিবারিক সহিংসতা অনেক সময় দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ, অবিশ্বাস, দাম্পত্য দ্বন্দ্ব এবং ক্রমবর্ধমান সংঘাতের ভয়াবহ পরিণতিতে রূপ নেয়। এ ধরনের ঘটনায় দ্রুত অভিযোগ গ্রহণ, নিরপেক্ষ তদন্ত, বৈজ্ঞানিক আলামত বিশ্লেষণ এবং অপরাধের প্রকৃত কারণ উদঘাটন বিচার নিশ্চিত করার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, এই মামলার ক্ষেত্রেও সেই লক্ষ্য সামনে রেখেই তদন্ত কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
মন্তব্য