নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকায় ১১ বছর বয়সী শিশু হোসাইন হত্যাকাণ্ডে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর ও উদ্বেগজনক তথ্য। সমবয়সী কয়েকজন কিশোরের হাতে পরিকল্পিতভাবে তার মৃত্যু ঘটে বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে। পুলিশ জানিয়েছে, অপরাধবোধ বা পূর্বশত্রুতা নয়; বরং “জেলে গেলে কেমন লাগে”—এমন কৌতূহল থেকেই তারা এই নৃশংস ঘটনার পরিকল্পনা করে।
ঘটনার সূত্রপাত হয় গত ১৮ এপ্রিল সকালে। ওইদিন হোসাইন তার বাড়ি থেকে বের হয়ে আর ফিরে আসেনি। পরিবার প্রথমে আত্মীয়-স্বজনের কাছে খোঁজাখুঁজি করলেও কোনো সন্ধান মেলেনি। পরে বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানো হয়। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর ২৪ এপ্রিল ফতুল্লা রেলস্টেশন সংলগ্ন একটি পরিত্যক্ত ভবন থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মরদেহ উদ্ধারের পর এলাকায় শোকের পাশাপাশি আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
তদন্তে জানা যায়, এলাকায় নিয়মিত আড্ডা দেওয়া এবং মাদকাসক্তির সঙ্গে জড়িত কয়েকজন কিশোর এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত। তাদের মধ্যে সাইফুল, তানভীর ও ইউনূস মূল পরিকল্পনা তৈরি করে। জিজ্ঞাসাবাদে উঠে আসে, তারা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে জানতে চায়—কাউকে হত্যা করলে জেলে যেতে হয়, আর সেই অভিজ্ঞতা কেমন হয়। এই অমানবিক কৌতূহলই তাদের অপরাধের পথে ঠেলে দেয়।
পরিকল্পনা অনুযায়ী তারা পথচারী শিশু হোসাইনকে টার্গেট করে। গাঁজা সেবনের প্রলোভন দেখিয়ে তাকে নির্জন একটি পরিত্যক্ত ভবনে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আগে থেকেই রাহাত, হোসাইন ও ওমর উপস্থিত ছিল। এরপর সবাই মিলে ধারালো অস্ত্র দিয়ে হোসাইনের ওপর আঘাত করে তাকে হত্যা করে এবং মরদেহ ঘটনাস্থলেই ফেলে পালিয়ে যায়।
ঘটনার পরপরই তদন্ত শুরু করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ২৫ এপ্রিল প্রথমে ইয়াসিন নামে একজনকে আটক করা হয়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একে একে আরও কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এখন পর্যন্ত মোট ছয়জন কিশোরকে আটক করা হয়েছে, যাদের মধ্যে চারজন সরাসরি পরিকল্পনা ও হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিল বলে জানা গেছে। একজন এখনও পলাতক রয়েছে।
গ্রেপ্তারদের মধ্যে একজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে, যেখানে সে হত্যাকাণ্ডের পুরো পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের বর্ণনা দেয়। ঘটনাস্থল থেকে হত্যায় ব্যবহৃত ধারালো অস্ত্রও উদ্ধার করা হয়েছে।
অভিযুক্তদের বিস্তারিত তথ্য নিচে দেওয়া হলো—
| ক্রম | নাম | ভূমিকা | বর্তমান অবস্থা |
|---|---|---|---|
| ১ | ইয়াসিন | পরিকল্পনা ও অংশগ্রহণ | গ্রেপ্তার |
| ২ | সাইফুল | মূল পরিকল্পনাকারী | গ্রেপ্তার |
| ৩ | তানভীর | পরিকল্পনাকারী | গ্রেপ্তার |
| ৪ | ইউনূস | পরিকল্পনাকারী | গ্রেপ্তার |
| ৫ | রাহাত | সরাসরি অংশগ্রহণ | গ্রেপ্তার |
| ৬ | ওমর | সরাসরি অংশগ্রহণ | গ্রেপ্তার |
| ৭ | অজ্ঞাত কিশোর | সহযোগী | পলাতক |
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কিশোরদের মধ্যে মাদকাসক্তি, অপরাধপ্রবণ আড্ডা এবং নিয়ন্ত্রণহীন পরিবেশ এই ধরনের ভয়াবহ ঘটনার জন্ম দিচ্ছে। তারা আরও বলেন, শুধু আইনগত ব্যবস্থা নয়, সামাজিক ও পারিবারিক পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি না হলে এ ধরনের অপরাধ ভবিষ্যতেও ঘটতে পারে।
এই নির্মম হত্যাকাণ্ডে পুরো ফতুল্লা এলাকায় গভীর শোক ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। স্থানীয়রা শিশু-কিশোরদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের জোর দাবি জানিয়েছেন।
