সেপটিক ট্যাংকের বিষাক্ত গ্যাসে দুই শ্রমিক নিহত

পটুয়াখালী সদর উপজেলার কমলাপুর ইউনিয়নের চৌদ্দবুড়িয়া গ্রামে নির্মাণাধীন একটি ভবনের সেপটিক ট্যাংকে নেমে বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে দুই শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। বুধবার (১৭ জুন) সকাল থেকে দুপুরের মধ্যবর্তী সময়ে ঘটে যাওয়া এ ঘটনায় পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। নিহতরা হলেন ৫০ বছর বয়সী আশরাফ এবং ২৬ বছর বয়সী মো. নুহ। তারা উভয়েই একই গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন।

স্থানীয় সূত্র, প্রত্যক্ষদর্শী এবং জনপ্রতিনিধিদের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রামের বাসিন্দা আফতার সিকদারের নির্মাণাধীন ভবনের একটি সেপটিক ট্যাংকের ভেতরে নির্মাণকাজের সময় ব্যবহৃত সেন্টারিংয়ের কাঠ ও বাঁশ দীর্ঘদিন ধরে পড়ে ছিল। সেগুলো সরিয়ে ফেলতে প্রথমে অভিজ্ঞ শ্রমিক আশরাফ ট্যাংকের ভেতরে প্রবেশ করেন। কিন্তু কিছু সময় পরও তিনি বাইরে না আসায় এবং কোনো সাড়া না দেওয়ায় উদ্বেগ দেখা দেয়।

পরিস্থিতি বুঝতে এবং আশরাফকে উদ্ধারের উদ্দেশ্যে পরে মো. নুহ ট্যাংকের ভেতরে নামেন। কিন্তু তিনিও কয়েক মুহূর্তের মধ্যে বিষাক্ত গ্যাসের প্রভাবে অচেতন হয়ে পড়েন। ফলে দুজনই সেপটিক ট্যাংকের ভেতরে আটকা পড়ে যান।

ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় লোকজন দ্রুত ঘটনাস্থলে জড়ো হন। তারা ট্যাংকের একটি অংশ ভেঙে ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করেন এবং দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর দুই শ্রমিককে বাইরে নিয়ে আসেন। তবে তখন আর তাদের বাঁচানো সম্ভব হয়নি। স্থানীয়রা ঘটনাস্থলেই তাদের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা সেপটিক ট্যাংক, ম্যানহোল, নর্দমা কিংবা অন্যান্য আবদ্ধ স্থানে অক্সিজেনের মাত্রা বিপজ্জনকভাবে কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে সেখানে মিথেন, হাইড্রোজেন সালফাইড, কার্বন ডাই-অক্সাইডসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর গ্যাস জমা হয়। এসব গ্যাস মানুষের শ্বাসপ্রশ্বাসে বাধা সৃষ্টি করে এবং কয়েক মিনিটের মধ্যেই অজ্ঞান হয়ে যাওয়া কিংবা মৃত্যুর কারণ হতে পারে। বিশেষ করে হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস উচ্চমাত্রায় উপস্থিত থাকলে তা অত্যন্ত প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে।

নিহত দুই শ্রমিকের সংক্ষিপ্ত পরিচয় নিচের সারণিতে তুলে ধরা হলো—

বিষয়আশরাফমো. নুহ
বয়স৫০ বছর২৬ বছর
পেশারাজমিস্ত্রীদিনমজুর
বৈবাহিক অবস্থাবিবাহিতসদ্য বিবাহিত
পারিবারিক অবস্থাতিন সন্তানের জনকনতুন সংসার শুরু করেছিলেন
বাসস্থানচৌদ্দবুড়িয়া গ্রামচৌদ্দবুড়িয়া গ্রাম

স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আবু জাফর জানান, নিহত দুজনই পাশাপাশি বাড়িতে বসবাস করতেন এবং এলাকার পরিচিত শ্রমজীবী মানুষ ছিলেন। আশরাফ দীর্ঘদিন ধরে রাজমিস্ত্রীর কাজ করে পরিবারের ভরণপোষণ করতেন। অন্যদিকে নুহ সম্প্রতি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে নতুন জীবন শুরু করেছিলেন। তাদের আকস্মিক মৃত্যু শুধু দুটি পরিবার নয়, পুরো গ্রামের জন্যই গভীর বেদনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নির্মাণ ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সেপটিক ট্যাংক বা এ ধরনের আবদ্ধ স্থানে প্রবেশের আগে গ্যাসের উপস্থিতি পরীক্ষা, পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা, সুরক্ষা পোশাক ও শ্বাস-প্রশ্বাসের উপযোগী সরঞ্জাম ব্যবহার এবং জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা প্রস্তুত রাখা বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত। অনেক ক্ষেত্রেই নিরাপত্তা নির্দেশিকা উপেক্ষা করার কারণে এমন দুর্ঘটনা ঘটে থাকে।

ঘটনার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া না গেলেও স্থানীয়রা ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা রোধে নির্মাণকাজে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। এদিকে দুই শ্রমিকের অকাল মৃত্যুতে তাদের পরিবারে নেমে এসেছে শোকের মাতম, আর চৌদ্দবুড়িয়া গ্রামজুড়ে বিরাজ করছে গভীর শোক ও বিষণ্নতা।