সুরের জাদুকর লাকী আখন্দের জীবনগাথা

বাংলা আধুনিক গানের ইতিহাসে লাকী আখন্দ একটি অবিস্মরণীয় নাম। তিনি একাধারে প্রখ্যাত সুরকার, সংগীত পরিচালক, গায়ক এবং আধুনিক বাংলা গানের অন্যতম অগ্রপথিক। তাঁর অনন্য সৃষ্টিশীলতা ও সুরের জাদু বাংলা গানের জগৎকে এক নতুন ও আধুনিক মাত্রায় উন্নীত করেছে। ‘এই নীল মনিহার’, ‘আবার এলো যে সন্ধ্যা’ এবং ‘আমায় ডেকো না’-র মতো অসংখ্য কালজয়ী গান সৃষ্টির মাধ্যমে তিনি শ্রোতাদের হৃদয়ে চিরস্থায়ী আসন লাভ করেছেন।

প্রারম্ভিক জীবন ও সংগীতের হাতেখড়ি

১৯৫৬ সালের ৭ জুন পুরান ঢাকার পাতলা খান লেনে লাকী আখন্দের জন্ম হয়। তাঁর পরিবারে সংগীতের একটি গভীর আবহ ছিল। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে তিনি তাঁর বাবার কাছ থেকে সংগীতের প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ শুরু করেন। অত্যন্ত শিশু বয়সেই তিনি টেলিভিশন এবং বেতারের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করার সুযোগ পান এবং নিজের অসাধারণ প্রতিভার পরিচয় দেন।

শৈশব ও কৈশোরে অভাবনীয় সাফল্য

লাকী আখন্দের সংগীত প্রতিভা অত্যন্ত অল্প বয়সেই চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। মাত্র ১৪ বছর বয়সে তিনি ‘এইচএমভি পাকিস্তান’-এর সুরকার হিসেবে যুক্ত হন। এর ঠিক দুই বছর পর, অর্থাৎ মাত্র ১৬ বছর বয়সে তিনি ‘এইচএমভি ভারত’-এর সংগীত পরিচালক হিসেবে কাজ করার বিরল গৌরব অর্জন করেন। এত অল্প বয়সে আন্তর্জাতিক স্তরের প্রতিষ্ঠানে এমন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব লাভ বাংলা সংগীতের ইতিহাসে একটি নজিরবিহীন ও বিস্ময়কর ঘটনা। ১৯৬৯ সালে তিনি পাকিস্তান আর্ট কাউন্সিল থেকে ‘বাংলা আধুনিক গান’ বিভাগে বিশেষ পদক লাভ করেন।

হ্যাপী আখন্দের সাথে সৃজনশীল মেলবন্ধন ও ‘ঘুড্ডি’ চলচ্চিত্র

১৯৭৫ সালে লাকী আখন্দ তাঁর ছোট ভাই হ্যাপী আখন্দের একটি অ্যালবামের সংগীতায়োজন করেন। এই অ্যালবামে অন্তর্ভুক্ত ছিল ‘আবার এলো যে সন্ধ্যা’, ‘কে বাঁশি বাজায় রে’, ‘স্বাধীনতা তোমাকে নিয়ে’ এবং ‘পাহাড়ি ঝর্ণা’-র মতো বিখ্যাত কিছু গান। পরবর্তীকালে ১৯৮০ সালে সৈয়দ সালাউদ্দিন জাকী পরিচালিত ‘ঘুড্ডি’ নামক চলচ্চিত্রে ‘আবার এলো যে সন্ধ্যা’ গানটি যুক্ত করা হয়। চলচ্চিত্রটি প্রকাশের পর এই গানটি দেশজুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। তিনি জনপ্রিয় ব্যান্ড ‘হ্যাপী টাচ’-এর একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন। এর বাইরেও তিনি দীর্ঘ সময় বাংলাদেশ বেতারের সংগীত বিভাগের পরিচালক হিসেবে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন।

কর্মজীবনের উল্লেখযোগ্য তথ্যাবলী

লাকী আখন্দের বর্ণাঢ্য সংগীত জীবনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক এবং তথ্যাবলী নিচে টেবিলের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:

সালঐতিহাসিক ঘটনা ও কর্মজীবন
১৯৫৬পুরান ঢাকার পাতলা খান লেনে জন্ম গ্রহণ করেন।
১৯৬৯পাকিস্তান আর্ট কাউন্সিল থেকে ‘বাংলা আধুনিক গান’ বিভাগে পদক লাভ।
১৯৭০-এর দশকমাত্র ১৪ বছর বয়সে ‘এইচএমভি পাকিস্তান’ এবং ১৬ বছর বয়সে ‘এইচএমভি ভারত’-এ যোগদান।
১৯৭৫ছোট ভাই হ্যাপী আখন্দের অ্যালবামের সংগীতায়োজন (যেখানে ‘আবার এলো যে সন্ধ্যা’ গানটি ছিল)।
১৯৮০‘ঘুড্ডি’ চলচ্চিত্রে ‘আবার এলো যে সন্ধ্যা’ গানের অন্তর্ভুক্তি ও দেশব্যাপী ব্যাপক জনপ্রিয়তা।
১৯৮৪‘সরগম’-এর ব্যানারে প্রথম একক অ্যালবাম ‘লাকী আখন্দ’ প্রকাশ।
১৯৮৭প্রিয় ছোট ভাই হ্যাপী আখন্দের অকাল মৃত্যু এবং সংগীত থেকে সাময়িক বিরতি।
১৯৯৮‘পরিচয় কবে হবে’ এবং ‘বিতৃষ্ণা জীবনে আমার’ অ্যালবামের মাধ্যমে সংগীতে প্রত্যাবর্তন।
২০১৭দীর্ঘকাল ফুসফুসের ক্যান্সারের সাথে যুদ্ধ করে ২১ এপ্রিল পরলোকগমন।

ব্যক্তিগত শোক, বিরতি ও সংগীতে প্রত্যাবর্তন

১৯৮৭ সালে লাকী আখন্দের জীবনের এক অন্ধকার অধ্যায় নেমে আসে। এই বছরে তাঁর অত্যন্ত প্রিয় ছোট ভাই হ্যাপী আখন্দের অকাল মৃত্যু ঘটে। এই আকস্মিক শোক তিনি সহজে মেনে নিতে পারেননি, যা তাঁকে মানসিকভাবে গভীরভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। ফলস্বরূপ, তিনি দীর্ঘ সময়ের জন্য সংগীতচর্চা এবং সুরের ভুবন থেকে সম্পূর্ণ দূরে সরে যান। দীর্ঘ এক যুগ বা প্রায় বারো বছর পর, ১৯৯৮ সালে তিনি পুনরায় সংগীতের জগতে ফিরে আসেন। সেই সময়ে তিনি ‘পরিচয় কবে হবে’ এবং ‘বিতৃষ্ণা জীবনে আমার’ নামক দুটি অ্যালবামের সংগীতায়োজন করেন, যা তাঁর শ্রোতাদের মাঝে পুনরায় সাড়া জাগায়।

শেষ জীবন ও মহাপ্রয়াণ

জীবনের শেষভাগে এই কিংবদন্তি শিল্পী মারাত্মক ব্যাধিতে আক্রান্ত হন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ফুসফুসের ক্যান্সারের সাথে লড়াই করেছেন। চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় ২০১৭ সালের ২১ এপ্রিল এই মহান সুরকার ও শিল্পী পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর শারীরিক মৃত্যু ঘটলেও, তাঁর রেখে যাওয়া কালজয়ী সৃষ্টি ও সুরের অমলীন আলো আজও প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে এবং বাংলা গানের আঙিনায় সমানভাবে উজ্জ্বল হয়ে আছে।