খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২০ই জুলাই ২০২৬, ৪:৪৮ পিএম

সিলেট বিভাগে হামের প্রাদুর্ভাব এখনো উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ ও নিউমোনিয়াজনিত জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে আরও তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে ৫৮ জন রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হওয়ায় জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। বর্তমানে বিভাগের সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন হাসপাতালে মোট ২৬৫ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. মাহবুবুল আলম জানিয়েছেন, মারা যাওয়া তিন শিশুই সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ)-এ চিকিৎসাধীন ছিলেন। সর্বশেষ এই মৃত্যুগুলোর পর সিলেট বিভাগে সন্দেহজনক ও পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হামে মোট মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১০৩ জনে পৌঁছেছে। নিহতদের মধ্যে ১০২ জন শিশু এবং একজন নার্স রয়েছেন।
মারা যাওয়া শিশুদের মধ্যে রয়েছেন হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলার সাদবপুর খাগাউড়া গ্রামের তাজুল ইসলামের দেড় বছর বয়সী মেয়ে তাসফিয়া, সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার বনগাগাতিয়া এলাকার শামছুল ইসলামের এক বছর সাত মাস বয়সী ছেলে আব্দুল্লাহ এবং সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার হরিনাপাটি এলাকার আইন উদ্দিনের আট মাস বয়সী ছেলে তানভীর আহমদ। তিনজনই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।
স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত সিলেট বিভাগে পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৪৫ জনে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে সুনামগঞ্জ জেলায়, যেখানে আক্রান্তের সংখ্যা ২৮৭। সিলেট জেলায় ১৮০ জন, হবিগঞ্জে ৫৬ জন এবং মৌলভীবাজারে ২২ জন আক্রান্ত হয়েছেন। হবিগঞ্জের আক্রান্তদের মধ্যে দুইজনের শরীরে রুবেলার সংক্রমণও শনাক্ত হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন কোনো ল্যাব-নিশ্চিত রোগী শনাক্ত না হলেও উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
নতুন ভর্তি হওয়া ৫৮ রোগীর মধ্যে ২৯ জন ভর্তি হয়েছেন সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং ২৪ জন শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে। এছাড়া মাউন্ট এডোরা হাসপাতালে একজন, মৌলভীবাজার জেলা সদর হাসপাতালে দুইজন এবং সুনামগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে দুইজন ভর্তি হয়েছেন।
বর্তমানে বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ২৬৫ রোগীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১০৫ জন রয়েছেন শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে। ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন ৯২ জন। এছাড়া সুনামগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে ২৯ জন, রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল হাসপাতালে ১১ জন, মৌলভীবাজার জেলা সদর হাসপাতালে ১০ জন, নর্থ ইস্ট হাসপাতালে সাতজন, মাউন্ট এডোরা হাসপাতালে তিনজন, লায়ন্স হাসপাতালে তিনজন, হবিগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে তিনজন, বিশ্বনাথ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একজন এবং ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একজন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
স্বাস্থ্য বিভাগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এ পর্যন্ত সিলেট বিভাগে সন্দেহজনক হামে ৯৯ জন এবং পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হামে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। জেলা ভিত্তিক হিসেবে সবচেয়ে বেশি ৪৭ জনের মৃত্যু হয়েছে সুনামগঞ্জে। এরপর সিলেটে ৩৫ জন, মৌলভীবাজারে ১২ জন এবং হবিগঞ্জে নয়জনের মৃত্যু হয়েছে।
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। এটি মূলত আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশির মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্ধারিত সময় অনুযায়ী এমআর (হাম-রুবেলা) টিকা গ্রহণই এ রোগ প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়। সময়মতো টিকাদান নিশ্চিত করা গেলে অধিকাংশ সংক্রমণ এবং গুরুতর জটিলতা এড়ানো সম্ভব।
চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, শিশুদের জ্বর, সর্দি, কাশি, চোখ লাল হয়ে যাওয়া এবং শরীরে লালচে দানা দেখা দিলে তা অবহেলা করা উচিত নয়। এসব উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। বিশেষ করে শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া বা পানিশূন্যতার মতো জটিলতা দেখা দিলে বিলম্ব না করে হাসপাতালে ভর্তি করানো প্রয়োজন।
স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, আক্রান্তদের চিকিৎসা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে নিবিড় নজরদারি, রোগী পর্যবেক্ষণ এবং প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে অভিভাবকদের শিশুদের জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির আওতায় নির্ধারিত সময় অনুযায়ী টিকা গ্রহণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকাদানের হার বাড়ানো এবং উপসর্গ দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা গ্রহণের সচেতনতা বৃদ্ধি করতে পারলেই ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রাণহানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
মন্তব্য