জি-লাইভ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৩ই জুলাই ২০২৬, ৩:২৯ পিএম

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে যে কজন নেতার নাম চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে, তাঁদের অন্যতম তাজউদ্দিন আহমেদ। তিনি ছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী, মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকারের দক্ষ সংগঠক, দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক এবং নীতিনিষ্ঠ রাজনীতির এক উজ্জ্বল প্রতীক।
আজ ২৩ জুলাই তাঁর জন্মের ১০১তম বার্ষিকী। ১৯২৫ সালের এই দিনে গাজীপুর জেলার কাপাসিয়া উপজেলার দরদরিয়া গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছি এই মহান জাতীয় নেতাকে।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গণহত্যা শুরুর পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেপ্তার হলে মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক নেতৃত্বের সবচেয়ে কঠিন দায়িত্ব এসে পড়ে তাজউদ্দিন আহমেদের কাঁধে। অসাধারণ বিচক্ষণতা, ধৈর্য, সাহস ও কূটনৈতিক দক্ষতায় তিনি ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় (বর্তমান মুজিবনগর) গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের শপথ অনুষ্ঠান সম্পন্ন করেন এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনায় নেতৃত্ব দেন।
তাঁর নেতৃত্বে প্রবাসী সরকার আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়, মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করা, প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলা এবং যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক সাফল্য অর্জন করে। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে তিনি ছিলেন জাতীয় ঐক্যের প্রতীক এবং বিজয়ের অন্যতম প্রধান স্থপতি।
১৯৭১ সালের ২২ ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামসহ প্রবাসী সরকারের নেতারা বিজয়ীর বেশে ফিরে আসেন। এরপর ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগার থেকে দেশে প্রত্যাবর্তন করলে তাজউদ্দিন আহমেদ প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব তাঁর হাতে অর্পণ করেন এবং নিজে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
স্বাধীন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে তাঁর অবদান ছিল অসামান্য। ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে তিনি ঢাকা-২২ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তাঁর হাত ধরেই বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় বাজেট প্রণীত হয় এবং দেশের প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার ভিত্তি রচিত হয়। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে পুনর্গঠনের লক্ষ্যে তিনি পরিকল্পিত অর্থনীতি, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং আত্মনির্ভরশীল রাষ্ট্র গঠনের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।
স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন প্রশ্নে আওয়ামী লীগের ভেতরে মতপার্থক্য ধীরে ধীরে প্রকট হতে থাকে। ১৯৭৪ সালের আওয়ামী লীগের দ্বিবার্ষিক কাউন্সিলে তাজউদ্দিন আহমেদ দল, সরকার এবং জনগণের মধ্যে দূরত্ব কমিয়ে সংগঠনকে আরও গণমুখী করার আহ্বান জানান। তিনি বিশ্বাস করতেন—একটি রাজনৈতিক দলের শক্তির মূল উৎস জনগণের আস্থা ও গণতান্ত্রিক চর্চা।
পরে রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতি নিয়ে তাঁর সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর নীতিগত মতভেদ সৃষ্টি হয়। ১৯৭৫ সালে একদলীয় শাসনব্যবস্থা (বাকশাল) প্রবর্তনের প্রেক্ষাপটে তিনি মন্ত্রিসভা থেকে সরে দাঁড়ান। ইতিহাসবিদদের মতে, এটি ছিল তাঁর নীতিনিষ্ঠ রাজনৈতিক অবস্থানেরই বহিঃপ্রকাশ।
বঙ্গবন্ধুর কাছে লেখা তাঁর পদত্যাগপত্রে তিনি লিখেছিলেন—
«”যে দেশের মানুষ গণতন্ত্রের জন্য চিরকাল সংগ্রাম করেছে, সে দেশের মানুষ শাসনকার্য পরিচালনার সুবিধার্থে রাজনীতির এই পরিবর্তন কখনও মেনে নেবে না।”»
এই একটি বাক্যই তাঁর রাজনৈতিক দর্শন, গণতন্ত্রের প্রতি অটল বিশ্বাস এবং নৈতিক দৃঢ়তার পরিচয় বহন করে।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের পর তাঁকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়। এরপর ৩ নভেম্বর ১৯৭৫, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতার সঙ্গে তাকেও নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে জেলহত্যা দিবস এক গভীর বেদনার অধ্যায়, আর তাজউদ্দিন আহমেদ সেই ট্র্যাজেডির অন্যতম মহান শহীদ।
তাজউদ্দিন আহমেদ ছিলেন ক্ষমতার মোহমুক্ত একজন বিরল রাজনীতিক। ব্যক্তিগত সম্পদ নয়, মানুষের ভালোবাসাই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন। সততা, মেধা, দেশপ্রেম এবং আত্মত্যাগের এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে তিনি আজও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আলোকবর্তিকা হয়ে আছেন।
আজ যখন রাজনীতিতে আদর্শ, সততা ও জনকল্যাণের প্রশ্ন নতুন করে আলোচিত হয়, তখন তাজউদ্দিন আহমেদের জীবন ও কর্ম আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। তাঁর স্বপ্ন ছিল—একটি গণতান্ত্রিক, বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক ও আত্মমর্যাদাশীল বাংলাদেশ।
সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের দায় আজ আমাদের সকলের।
মৃত্যু দিয়ে তিনি শোধ করেছেন জন্মের ঋণ।
গভীর শ্রদ্ধা ও বিনম্র কৃতজ্ঞতায় স্মরণ করছি স্বাধীনতার এই মহান স্থপতিকে।
শ্রদ্ধাঞ্জলি, তাজউদ্দিন আহমেদ।
মন্তব্য