খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৯ই জুন ২০২৬, ৬:৩ পিএম

নাইটক্লাব-সংক্রান্ত একটি অনাকাঙ্ক্ষিত বিতর্কের পর সতীর্থদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করে অধিনায়ক হিসেবেই নটিংহাম টেস্টে মাঠে নেমেছিলেন বেন স্টোকস। ম্যাচের তৃতীয় দিন পর্যন্ত মাঠের ভেতরে বা বাইরে সবকিছুই একদম স্বাভাবিক মনে হচ্ছিল। তবে চতুর্থ দিনে এসে হঠাৎই সবাইকে স্তব্ধ করে দিলেন তিনি। ক্রিকেটবিশ্বকে পুরোপুরি চমকে দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে আকস্মিক অবসরের ঘোষণা দিলেন ইংল্যান্ডের এই কিংবদন্তি অলরাউন্ডার। চলমান নটিংহাম টেস্টই হতে যাচ্ছে তাঁর বর্ণাঢ্য আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচ। এরপর আর কখনো ইংল্যান্ডের ঐতিহ্যবাহী জার্সিতে দেখা যাবে না আধুনিক ক্রিকেটের অন্যতম সেরা এই ম্যাচ উইনারকে।
নটিংহাম টেস্টের চতুর্থ দিনের প্রথম সেশনের খেলা শেষ হওয়ার পর ড্রেসিংরুমে সতীর্থদের ডেকে নিজের এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা জানান স্টোকস। অবসরের ঘোষণা দেওয়ার সময় তিনি বেশ আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। সতীর্থদের উদ্দেশে আবেগঘন কণ্ঠে তিনি বলেন, “মাঠে গিয়ে আগামী দুই দিনে তোমরা নিজেদের সর্বস্ব উজাড় করে দাও।” তাঁর বক্তব্য শেষ হওয়ার সাথে সাথেই ইংল্যান্ড দলের সমস্ত খেলোয়াড় এবং কোচিং স্টাফরা দাঁড়িয়ে করতালির মাধ্যমে এই মহান ক্রিকেটারকে সম্মান জানান। ড্রেসিংরুমের পরিবেশ তখন বেশ ভারী হয়ে উঠেছিল।
হঠাৎ এমন বিদায়ের পেছনের সুনির্দিষ্ট কারণ অবশ্য পুরোপুরি স্পষ্ট করেননি স্টোকস। মানসিক ক্লান্তি নাকি সাম্প্রতিক বিতর্ক এর পেছনে কাজ করেছে, তা নিয়ে জল্পনা থাকলেও স্টোকস কেবল দলের প্রতি তাঁর ভালোবাসার কথাই পুনর্ব্যক্ত করেছেন। বিদায়ী বার্তায় তিনি বলেন, “দলের জন্য, তোমাদের জন্য এবং আমাদের আগে যাঁরা এই গৌরবময় জার্সি পরেছেন, তাঁদের সম্মানে আমি সবসময় মাঠে নিজের সর্বোচ্চটা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। আর মাত্র একটা বার আমি সেই লড়াইটা লড়ব।”
ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ডের (ইসিবি) প্রধান নির্বাহী রিচার্ড গুল্ড স্টোকসের এই আকস্মিক সিদ্ধান্তে বিস্ময় প্রকাশ করলেও তাঁর অসামান্য অবদানের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, “আমরা আজ এমন একজন ক্রিকেটারকে হারাচ্ছি যিনি একাধারে একজন দুর্দান্ত ব্যাটসম্যান, অত্যন্ত কার্যকর বোলার, অনুপ্রেরণাদায়ী অধিনায়ক এবং ড্রেসিংরুমের অন্যতম সেরা ব্যক্তিত্ব। ইংল্যান্ড ক্রিকেটের ইতিহাসে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। আমরা তাঁর এবং তাঁর পরিবারের আগামী দিনগুলোর জন্য আন্তরিক শুভকামনা জানাচ্ছি।”
২০১১ সালে মাত্র এক মাসের ব্যবধানে ইংল্যান্ডের হয়ে ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে অভিষেক হয়েছিল বেন স্টোকসের। এরপর দ্রুতই তিন সংস্করণে নিজেকে বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন তিনি। ইংল্যান্ডের ক্রিকেট ইতিহাসে তাঁর নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে মূলত দুটি বিশ্বকাপ জয়ের মহানায়ক হিসেবে। ২০১৯ সালের ঘরের মাঠে ওয়ানডে বিশ্বকাপ ফাইনাল এবং ২০২২ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জয়ে তিনি অবিশ্বাস্য ও বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। এছাড়া টেস্ট ক্রিকেটে, বিশেষ করে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে অ্যাশেজ সিরিজে হেডিংলি টেস্টের সেই অতিমানবীয় ইনিংসসহ ইংল্যান্ডের বহু স্মরণীয় সাফল্যের রূপকার ছিলেন এই অলরাউন্ডার।
দীর্ঘ দেড় দশকের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে ইংল্যান্ডের হয়ে ১২২টি টেস্ট, ১১৪টি ওয়ানডে এবং ৪৩টি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলেছেন বেন স্টোকস। ক্রিকেটের রাজকীয় সংস্করণ টেস্টে ১৪টি সেঞ্চুরি ও ৩৭টি ফিফটির সাহায্যে তিনি করেছেন ৭,২৪৩ রান এবং বল হাতে শিকার করেছেন ২৫২টি উইকেট। ওয়ানডে ক্রিকেটে ৫টি সেঞ্চুরি ও ২৪টি ফিফটিতে তাঁর সংগ্রহ ৩,৪৬৩ রান, এর পাশাপাশি নিয়েছেন ৭৪টি উইকেট। আর সংক্ষিপ্ত সংস্করণের টি-টোয়েন্টিতে দেশের হয়ে করেছেন ৫৮৫ রান এবং বল হাতে শিকার করেছেন ২৬টি উইকেট। নটিংহাম টেস্টের শেষ দুই দিনে ক্রিকেটপ্রেমীরা তাই চাতক পাখির মতো তাকিয়ে থাকবেন এই কিংবদন্তির শেষ লড়াইটি দেখার জন্য।
মন্তব্য