জিলাইভ [ GLive ] | truth alone triumphs

বড় হওয়ার চেয়ে ছোট থাকাই ভালো—শিশুমনেই জীবন কাটিয়েছেন মুস্তাফা মনোয়ার

বরেণ্য চিত্রশিল্পী, দেশীয় পাপেট আন্দোলনের পুরোধা ব্যক্তিত্ব ও খ্যাতনামা টেলিভিশন নির্দেশক মুস্তাফা মনোয়ার আর নেই। সোমবার সকালে রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে এই গুণী শিল্পীর বয়স হয়েছিল ৯০ বছর। তিনি দীর্ঘদিন ধরে নিউমোনিয়া ও প্রোস্টেট ক্যানসারের মতো বার্ধক্যজনিত জটিল রোগে ভুগছিলেন। চলতি মাসের মাঝামাঝি সময়ে শারীরিক অবস্থার অবণতি হলে তাঁকে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নেওয়া হয়। সেখানেই আজ সকালে শেষ হয় তাঁর নয় দশকের দীর্ঘ ও কর্মময় জীবন।

তাঁর প্রয়াণের খবর ছড়িয়ে পড়তেই দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে। সর্বস্তরের মানুষ এই গুণী মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে স্মৃতিচারণ করছেন। কেউ তাঁকে স্মরণ করছেন বিটিভির জনপ্রিয় রিয়েলিটি শো ‘নতুন কুঁড়ি’র রূপকার হিসেবে, কেউবা মনে করছেন ‘বাংলাদেশের পাপেটম্যান’ কিংবা দক্ষিণ এশিয়ার কোটি শিশুর প্রিয় ‘মীনা’ কার্টুনের পেছনের মূল কারিগরকে। তবে বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এই মানুষটি নিজেকে সবসময় একজন শিশু হিসেবেই দেখতেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি নিজের ভেতর একটি কৌতূহলী ও সরল শিশুমনে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। তাঁর কাছে বয়স ছিল কেবলই একটি সংখ্যা।

জীবনের নিজস্ব দর্শন ও সুরের প্রতি ভালোবাসা

২০১৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর নিজের জন্মদিনে একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানে জীবনের গভীর এক দর্শন উন্মোচন করেছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার। তিনি বলেছিলেন, বয়স দুই রকমের হয়—একটি অঙ্কের হিসাব, অন্যটি মনের তৃপ্তির ব্যাপার। পৃথিবীকে নতুন করে দেখা এবং তাকে ভালোবাসার ক্ষেত্রে মানুষের বয়স কখনো বাড়ে না। জন্মদিন নিয়ে তাঁর সরল স্বীকারোক্তি ছিল, “ছোটবেলায় বয়স বাড়লে খুব ভালো লাগত। কিন্তু একসময় বুঝলাম বড় হওয়া তো ভালো না, ছোট থাকাই ভালো।” এই কথাটির মধ্যেই লুকিয়ে ছিল তাঁর জীবনের মূল সারসংক্ষেপ। তিনি তরুণদের নিয়ে সবসময় আশাবাদী ছিলেন। মনে করতেন, তরুণদের ভেতরের স্বপ্নই একদিন দেশকে উন্নতির শিখরে নিয়ে যাবে।

শিল্পের পাশাপাশি সঙ্গীতের প্রতিও তাঁর ছিল গভীর অনুরাগ। ওস্তাদ ফাইয়াজ খাঁর শিষ্য সন্তোষ রায়ের কাছে কলকাতায় রীতিমতো গানের তালিম নিয়েছিলেন তিনি। শিল্পী নির্মলেন্দু চৌধুরীর দলের হয়ে টানা তিন বছর গান করেছেন। এমনকি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতায় ওয়াহিদুল হক ও সন্‌জীদা খাতুনের উদ্যোগে গড়ে ওঠা সাংস্কৃতিক দলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বিভিন্ন স্থানে দেশাত্মবোধক গান গেয়েছেন। তবে বাঁধাধরা নিয়মের প্রতি অনীহা থাকায় একসময় তিনি নিয়মিত গান গাওয়া ছেড়ে দেন এবং পুরোপুরি দৃশ্যশিল্পে মনোনিবেশ করেন।

ভাষা আন্দোলন থেকে পাপেটশিল্প ও টেলিভিশন

চিত্রশিল্পী হিসেবে মুস্তাফা মনোয়ারের খ্যাতি ছিল আন্তর্জাতিক পরিসরে। চারুকলায় পড়ার সময় তাঁর জলরঙের কাজের ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন বিশ্বখ্যাত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়। খুব অল্প রেখায় অনেক বড় কথা ফুটিয়ে তোলার এক জাদুকরি ক্ষমতা ছিল তাঁর তুলিতে। শুধু শিল্পচর্চায় নয়, ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনেও তিনি সক্রিয় ছিলেন। সে সময় ভাষা আন্দোলন নিয়ে কার্টুন আঁকার অপরাধে এক মাস কারাবরণ করতে হয়েছিল তৎকালীন এই স্কুলছাত্রকে।

বাংলাদেশে পাপেটশিল্পকে জনপ্রিয় ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার পেছনে একক অবদান মুস্তাফা মনোয়ারের। হুগলি ও কলকাতায় পাপেট দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি দেশে এই লোকশিল্পকে আধুনিক রূপ দেন। তাঁর তৈরি ‘পারুল’ চরিত্রটি দেখে ইউনিসেফ অনুপ্রাণিত হয়, যা পরবর্তীতে দক্ষিণ এশিয়ার শিশু জাগরণের প্রতীক ‘মীনা’ চরিত্রের জন্ম দেয়।

পরবর্তীতে চারুকলার শিক্ষকতা ছেড়ে তিনি তৎকালীন পাকিস্তান টেলিভিশনের ঢাকা কেন্দ্রে যোগ দেন, যাতে সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে বাঙালি সংস্কৃতিকে পৌঁছে দেওয়া যায়। বাংলাদেশ টেলিভিশনের স্বর্ণযুগে তাঁর নির্দেশনায় নির্মিত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রক্তকরবী’ কিংবা মুনীর চৌধুরীর ‘মুখরা রমণী বশীকরণ’ নাটক দুটি আজও মাইলফলক হয়ে আছে। ৯‌০ বছরের এক কৌতূহলী, স্বপ্নবাজ ও চিরতরুণ মনের অবসান ঘটলেও নিজের কালজয়ী সৃষ্টির মাঝে তিনি বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল।

Tags :

Shourav Gurukul

Recent News