খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ই জুন ২০২৬, ১০:৪৫ পিএম

রাজশাহী মহানগরীর বোয়ালিয়া থানার সাহেববাজার স্বর্ণপট্রিতে অবস্থিত ‘কারুশ্রী জুয়েলার্স’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানে দুই দোকানের মাঝখানের দেয়াল কেটে একটি বড় ধরনের চুরির ঘটনা ঘটেছে। তবে চুরির ঘটনাটি প্রকাশ পেলেও চোর কোন দিক দিয়ে দোকানে প্রবেশ করেছে, তা নিয়ে গভীর রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। চুরির শিকার কারুশ্রী জুয়েলার্সের ঠিক পাশেই অবস্থিত ‘আফিয়া জুয়েলার্স’। ঘটনার পর দেখা গেছে, দুটি দোকানেরই বাইরের প্রধান শাটারের তালা সম্পূর্ণ অক্ষত রয়েছে। ফলে চোর ঢোকার সুনির্দিষ্ট পথ নিয়ে তৈরি হওয়া রহস্যের জট এখনো খুলছে না।
শনিবার (২০ জুন) সকালে চুরির বিষয়টি প্রথম জানাজানি হয়। এই ঘটনায় দুই দোকানির পরস্পরবিরোধী বক্তব্য ও সন্দেহ প্রকাশের কারণে ঘটনাটি আরও বেশি ঘনীভূত হয়েছে। কারুশ্রী জুয়েলার্সের মালিক পক্ষের দাবি, চোর পাশের দোকান আফিয়া জুয়েলার্সের দেয়াল কেটে তাদের দোকানে প্রবেশ করেছে। অপরদিকে, আফিয়া জুয়েলার্সের মালিকের দাবি, কারুশ্রী জুয়েলার্সে চুরির পর চোরেরা তার দোকানের দিকে দেয়াল কেটে প্রবেশ করার চেষ্টা করে থাকতে পারে। ঘটনার পর থেকে স্থানীয় স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের মধ্যে ব্যাপক উত্তেজনা বিরাজ করছে।
Table of Contents
ক্ষতিগ্রস্ত মালিক পক্ষের তথ্য অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে শনিবার ভোর পর্যন্ত যেকোনো সময়ে সাহেববাজার স্বর্ণপট্রির কারুশ্রী জুয়েলার্সে এই চুরির ঘটনাটি ঘটে। মহানগরীর শাহমখদুম কলেজ এলাকার বাসিন্দা তূর্য সরকার ও তার ছোট ভাই ইমন সরকার বিগত প্রায় ২০ বছর ধরে এই দোকানে জুয়েলারি ব্যবসা পরিচালনা করে আসছেন।
মালিক পক্ষের দাবি, চোরেরা তাদের সিন্দুক ভেঙে দোকান থেকে আনুমানিক ২০০ ভরি স্বর্ণালংকার, ১ হাজার ২০০ ভরি ওজনের রুপার অলংকার এবং নগদ ২০ লাখ টাকা চুরি করে নিয়ে গেছে। চুরি হওয়া এই বিপুল পরিমাণ স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকার সর্বমোট বাজারমূল্য প্রায় সাড়ে ৫ কোটি টাকা। কারুশ্রী জুয়েলার্সের অন্যতম স্বত্বাধিকারী ইমন সরকার জানান, তারা নিরাপত্তার জন্য দোকানের কোনো মালামাল রাতে বাড়িতে নিয়ে যেতেন না, সব মালামাল দোকানেই থাকত। চোরেরা চুরির ঘটনা সম্পন্ন করার পর প্রামাণ্য তথ্য নষ্ট করার উদ্দেশ্যে দোকানের সিসিটিভি ক্যামেরার ডিভিআর (DVR) যন্ত্রটিও সাথে করে নিয়ে গেছে।
কারুশ্রী জুয়েলার্সটি সাহেববাজারের একটি তিনতলা ভবনের নিচতলায় অবস্থিত। উক্ত ভবনের নিচতলার সম্পূর্ণ অংশ জুয়েলার্সের দোকানপাটে সাজানো হলেও এর দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় একটি আবাসিক হোটেল পরিচালিত হয়। কারুশ্রীর ঠিক পাশের দোকানটি হলো আফিয়া জুয়েলার্স এবং এই দোকানের পাশ দিয়েই আবাসিক হোটেলে ওঠার প্রধান সিঁড়ির পথ চলে গেছে। সিঁড়ির মুখে একটি সাধারণ গেট থাকলেও আবাসিক হোটেলের গ্রাহকদের যাতায়াতের সুবিধার্থে সেটি সাধারণত সব সময়ই খোলা থাকে।
শনিবার সকালে কারুশ্রী জুয়েলার্সের মালিক তূর্য সরকারের চাচাতো ভাই মো. শুভ প্রতিদিনের মতো দোকানের শাটার খোলার পর ভেতরের সবকিছু এলোমেলো দেখতে পান। তিনি লক্ষ্য করেন, ভেতরের মূল সিন্দুকটি ভাঙা এবং কারুশ্রী ও আফিয়া জুয়েলার্সের মধ্যবর্তী ইটের দেয়ালের একটি অংশ কাটা রয়েছে। এই খবর পেয়ে তূর্য সরকার তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন এবং পাশের আফিয়া জুয়েলার্সের মালিক খন্দকার আরিফুর রহমানকে মুঠোফোনে বিষয়টি জানান।
খন্দকার আরিফুর রহমান এসে দেখতে পান যে, তার দোকানের শাটারের তালাগুলোও সম্পূর্ণ অক্ষত রয়েছে। পরবর্তীতে চাবি দিয়ে তালা খুলে ভেতরে প্রবেশের পর দেখা যায়, তার দোকানের দেয়াল কাটা থাকলেও ভেতরের সিন্দুকটি সম্পূর্ণ অক্ষত রয়েছে। আফিয়া জুয়েলার্সের সিন্দুকে থাকা প্রায় দেড় লাখ টাকা মূল্যের অলংকারসহ ভেতরের কোনো জিনিসই খোয়া যায়নি বা চুরি হয়নি।
আফিয়া জুয়েলার্সের মালিক খন্দকার আরিফুর রহমান এই বিষয়ে তার বক্তব্য প্রদান করে বলেন, “আমার দোকান দিয়ে যদি চোর প্রবেশ করত, তবে শাটারের তালা অবশ্যই ভাঙা থাকত। চুরির ঘটনা জানার পর আমি এসে চাবি দিয়ে তালা খুলে স্বাভাবিকভাবে দোকানে ঢুকেছি। আমার এবং কারুশ্রী—উভয় দোকানের শাটার ও তালা অক্ষত। এমনও হতে পারে, কারুশ্রীতে চুরির পর চোর দেয়াল কেটে আমার দোকানে ঢুকেছিল এবং সিন্দুক ভাঙার পর্যাপ্ত সময় হয়তো পায়নি।” তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, দ্রুতই এই ঘটনার আসল রহস্য উন্মোচন হবে।
Commercial ও আইনি প্রক্রিয়ার বাইরেও কারুশ্রী জুয়েলার্সের মালিক ইমন সরকারের কথাবার্তায় স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, তারা পাশের আফিয়া জুয়েলার্সের মালিক বা কর্মচারীদের এই ঘটনার সাথে সন্দেহ করছেন। তিনি administrations-এর ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ঘটনা জানাজানির ২৪ ঘণ্টা পার হয়ে গেলেও তারা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো দৃশ্যমান आश्वासन পাননি এবং পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে কাউকে আটক করেনি। চুরির এই ঘটনার প্রতিবাদে সাহেববাজার স্বর্ণপট্রির সকল জুয়েলার্স দোকান বন্ধ রেখে ব্যবসায়ীরা শনিবার বিক্ষোভ মিছিল প্রদর্শন করেছেন।
চুরির এই ঘটনার প্রেক্ষিতে গত শুক্রবার রাতে কারুশ্রী জুয়েলার্সের মালিক তূর্য সরকার বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে নগরের বোয়ালিয়া থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা বোয়ালিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মাসুদ কবির জানান, পুলিশ দুই দোকানের মালিকের সাথেই কথা বলেছে এবং তদন্তের স্বার্থে কেউই বর্তমানে সন্দেহের বাইরে নন।
তন্তের সার্বিক অগ্রগতি সম্পর্কে রাজশাহী মহানগর পুলিশের (আরএমপি) মুখপাত্র ও অতিরিক্ত উপকমিশনার গাজিউর রহমান রোববার বিকেলে জানান, জেলা পুলিশ ছাড়াও সরকারের একাধিক গোয়েন্দা ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এই রহস্য উদঘাটনে একসঙ্গে কাজ করছে। তারা ইতিমধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক তথ্য পেয়েছেন এবং সেগুলো সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। তথ্য নিশ্চিত হওয়া মাত্রই তা আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে।
বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বাজুস) রাজশাহী জেলা শাখার সভাপতি আশরাফুল ইসলাম জানান, দোষীদের গ্রেপ্তার এবং লুণ্ঠিত অলংকার উদ্ধারের জন্য বেঁধে দেওয়া ২৪ ঘণ্টার সময়সীমা ইতিমধ্যে পার হয়ে গেছে। তবে পুলিশ কমিশনার ও র্যাবসহ অন্যান্য সংস্থাসমূহ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছেন বলে আশ্বস্ত করেছেন। এই বিষয়ে পরবর্তী করণীয় ও নতুন কর্মসূচি নির্ধারণের লক্ষ্যে বাজুস জেলা শাখা রাতে জরুরি বৈঠকে বসবেন বলে তিনি নিশ্চিত করেছেন।
মন্তব্য