মোহাম্মদপুরে ছিনতাইচক্রের আন্তঃজেলা নেটওয়ার্ক উন্মোচিত

রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায় ধারাবাহিক ছিনতাইয়ের ঘটনায় জড়িত একটি সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের কার্যক্রম উদ্ঘাটন করেছে পুলিশ। তদন্তে উঠে এসেছে, চক্রের সদস্যরা নারায়ণগঞ্জে অবস্থান করলেও পরিকল্পিতভাবে পিকআপ ভ্যানে করে ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকায় এসে ছিনতাই চালাত এবং অপরাধ সংঘটনের পর দ্রুত আবার নারায়ণগঞ্জে ফিরে যেত। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়ানো এবং নিজেদের অবস্থান গোপন রাখতেই তারা এই কৌশল অবলম্বন করত বলে জানিয়েছে পুলিশ।

বুধবার রাজধানীর মিন্টো রোডে ঢাকা মহানগর পুলিশের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তদন্তের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়। পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, সম্প্রতি মোহাম্মদপুরের নূরজাহান রোডে দুই বোনের ছিনতাইয়ের ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে এই চক্রের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়।

ঘটনার সূত্রপাত গত ৩১ মে। ঈদের ছুটি শেষে ঠাকুরগাঁও থেকে ঢাকায় ফিরে ভোরের দিকে নিজেদের বাসার সামনে নামেন দুই বোন। ঠিক সেই সময় কয়েকজন দুর্বৃত্ত ধারালো অস্ত্র প্রদর্শন করে তাঁদের ভয়ভীতি দেখায় এবং সঙ্গে থাকা একটি ট্রলি, একটি হ্যান্ডব্যাগ ও অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী ছিনিয়ে নেয়। ঘটনার পরপরই পুলিশ আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ শুরু করে এবং প্রযুক্তিনির্ভর তদন্তের মাধ্যমে সন্দেহভাজনদের শনাক্ত করতে সক্ষম হয়।

তদন্তের একপর্যায়ে আনোয়ার হোসেন এবং জুয়েল ওরফে আরিফ নামে দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত একটি পিকআপ ভ্যান এবং একটি চাপাতি উদ্ধার করা হয়েছে। একই সঙ্গে এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত আরও কয়েকজনের পরিচয় শনাক্ত হয়েছে এবং তাঁদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

বিষয়তথ্য
ঘটনার তারিখ৩১ মে
ঘটনার স্থাননূরজাহান রোড, মোহাম্মদপুর
ভুক্তভোগীঠাকুরগাঁও থেকে ফেরা দুই বোন
গ্রেপ্তারকৃতআনোয়ার হোসেন, জুয়েল ওরফে আরিফ
উদ্ধারকৃত আলামতপিকআপ ভ্যান, চাপাতি
এখনো উদ্ধার হয়নিট্রলি ও মুঠোফোন
তদন্তের অবস্থাঅন্যান্য সদস্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে

তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার ফজলুল করিম জানান, চক্রের সদস্যরা একসময় মোহাম্মদপুর এলাকায় বসবাস করতেন। ফলে এলাকার অলিগলি, প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ, নির্জন স্থান এবং স্থানীয় পরিবেশ সম্পর্কে তাঁদের বিস্তারিত ধারণা ছিল। প্রায় ছয় মাস আগে তাঁরা নারায়ণগঞ্জে গিয়ে বাসা ভাড়া নেন। এরপর সেখান থেকেই তারা সংঘবদ্ধভাবে ছিনতাইয়ের পরিকল্পনা করত এবং নির্দিষ্ট সময় বেছে নিয়ে রাজধানীতে প্রবেশ করত।

পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, একই কৌশল ব্যবহার করে এই চক্র মোহাম্মদপুর এলাকায় অন্তত ১০টি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটিয়েছে। সাধারণত রাত দুইটার পর নারায়ণগঞ্জ থেকে পিকআপ নিয়ে রওনা হয়ে তারা ভোরের দিকে ঢাকায় প্রবেশ করত। সে সময় সড়কে মানুষের উপস্থিতি কম থাকায় বাসার সামনে নামা যাত্রী, দূরপাল্লার ভ্রমণ শেষে ফেরা পরিবার কিংবা নির্জন রাস্তায় চলাচলকারী ব্যক্তিদের লক্ষ্যবস্তু বানানো হতো।

তদন্তে আরও জানা গেছে, ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত পিকআপ ভ্যানের চালক ও মালিকের বিরুদ্ধেও সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁদের ভূমিকা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে।

গ্রেপ্তার হওয়া জুয়েলের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় অন্তত পাঁচটি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে দুটি মাদক-সংক্রান্ত, একটি ডাকাতি এবং দুটি নারী ও শিশু নির্যাতন-সংক্রান্ত মামলা। এ তথ্য থেকে ধারণা করা হচ্ছে, চক্রটির সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত।

পুলিশ জানিয়েছে, ছিনতাই হওয়া ট্রলি ও মুঠোফোন এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তবে সেগুলো উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। কর্মকর্তাদের মতে, নগরজুড়ে সিসিটিভি নজরদারি, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত পদ্ধতির কারণে আন্তঃজেলা অপরাধচক্র শনাক্ত ও দমনে এখন আগের তুলনায় বেশি সাফল্য পাওয়া যাচ্ছে। চলমান অভিযানের মাধ্যমে এই চক্রের আরও সদস্য গ্রেপ্তার হলে রাজধানীতে সংঘটিত একাধিক ছিনতাইয়ের রহস্য উন্মোচিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।