খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ই জুলাই ২০২৬, ৬:৩ পিএম

গাজা সিটিতে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকার মধ্যেই একটি আবাসিক ভবনে ইসরায়েলি হামলায় এক নারী ও তাঁর তিন মেয়ে নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে ফিলিস্তিনি বার্তা সংস্থা ওয়াফা। মঙ্গলবার ভোরে গাজা সিটির দক্ষিণাঞ্চলের আল থালাথিনি স্ট্রিটে ওই হামলা চালানো হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
হামলায় নিহত চারজন একই পরিবারের সদস্য বলে জানা গেলেও তাৎক্ষণিকভাবে তাঁদের নাম-পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। হামলার পর ঘটনাস্থলে কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং ভবনটির ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও কেউ আটকা পড়েছেন কি না, সে বিষয়েও তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। নিহতদের মধ্যে তিন শিশু বা কিশোরী ছিলেন কি না, সে বিষয়টিও প্রতিবেদনে স্পষ্ট করা হয়নি।
একই পরিবারের চার সদস্যের প্রাণহানির এই ঘটনা যুদ্ধবিরতির কার্যকারিতা এবং গাজায় বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। দীর্ঘ সংঘাতের কারণে উপত্যকার বহু পরিবার ইতোমধ্যে একাধিকবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে। অনেক মানুষ এখনো ধ্বংসপ্রাপ্ত বা ক্ষতিগ্রস্ত আবাসিক এলাকায় অনিরাপদ পরিবেশে বসবাস করছেন। ফলে কোনো ধরনের হামলার খবরই স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির পরও গাজা উপত্যকার বিভিন্ন এলাকায় ইসরায়েলি বাহিনীর হামলা বন্ধ হয়নি। তাদের দাবি, যুদ্ধবিরতির শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগে পরিচালিত এসব হামলায় নিয়মিতভাবে বেসামরিক মানুষের হতাহতের ঘটনা ঘটছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে ইসরায়েলি বাহিনীর পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত কোনো বক্তব্য পাওয়া গেছে কি না, তা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর সংঘটিত হামলাগুলোতে এ পর্যন্ত অন্তত ১ হাজার ১৫৮ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও ৩ হাজার ৭৫৬ জন। মন্ত্রণালয়ের দাবি, হামলার প্রভাব আবাসিক এলাকা ও সাধারণ মানুষের ওপর পড়েছে। তবে সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতির কারণে হতাহতের এসব পরিসংখ্যান স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন।
গাজার সামগ্রিক মানবিক পরিস্থিতিও দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত নাজুক। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের দেওয়া হিসাবে, ২০২৩ সালের ৮ অক্টোবর ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে গাজা উপত্যকায় অন্তত ৭৩ হাজার ২৫০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। একই সময়ে আহত হয়েছেন ১ লাখ ৭৩ হাজার ৭৫১ জন। এই বিপুল প্রাণহানি ও আহতের সংখ্যা উপত্যকাটির স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপরও ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করেছে।
যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব শুধু প্রাণহানিতে সীমাবদ্ধ নেই। গাজার আবাসন, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা এবং যোগাযোগ অবকাঠামোর বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে বলে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। তাদের দাবি, উপত্যকার প্রায় ৯০ শতাংশ বেসামরিক অবকাঠামো কোনো না কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে যুদ্ধবিরতির মধ্যেও বাস্তুচ্যুত মানুষের নিজ নিজ এলাকায় ফিরে যাওয়া এবং নিরাপদ ও স্বাভাবিক জীবন পুনর্গঠন করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
এদিকে, ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে প্রকাশিত তথ্যে দাবি করা হয়েছে, ২০২৫ সালের অক্টোবরের যুদ্ধবিরতি চুক্তির সময় গাজার প্রায় ৫৩ শতাংশ এলাকা ইসরায়েলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ছিল। পরবর্তী সময়ে নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকার পরিমাণ ৭০ শতাংশের বেশি হয়েছে বলেও ওই তথ্যগুলোতে দাবি করা হয়েছে। এই পরিস্থিতি সত্য হলে গাজার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের চলাচল, পুনর্বাসন এবং নিরাপদে ঘরে ফেরার সুযোগ আরও সীমিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সাম্প্রতিক এই হামলায় মা ও তাঁর তিন মেয়ের মৃত্যুর খবর যুদ্ধবিরতির বাস্তব প্রয়োগ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। আন্তর্জাতিক মহল দীর্ঘদিন ধরে গাজায় বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, মানবিক সহায়তা নির্বিঘ্নে পৌঁছানো এবং যুদ্ধবিরতি বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে আসছে। কিন্তু হামলা ও হতাহতের খবর অব্যাহত থাকায় উপত্যকার সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা এবং মানবিক সংকট কাটার লক্ষণ এখনও স্পষ্ট নয়।
তবে আল থালাথিনি স্ট্রিটের সর্বশেষ হামলার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য কী ছিল, কেন হামলাটি চালানো হয়েছে এবং এতে ভবনটির অন্য বাসিন্দারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন কি না—এসব বিষয়ে এখনো পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যায়নি। ইসরায়েলি বাহিনীর পক্ষ থেকেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। ফলে হামলার পরিস্থিতি ও দায় নির্ধারণের বিষয়ে আরও নির্ভরযোগ্য তথ্যের অপেক্ষা রয়েছে।
মন্তব্য