খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১১ই এপ্রিল ২০২৬, ৫:৪৮ পিএম

বাংলা সংগীতাঙ্গনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন রবীন্দ্রসঙ্গীতশিল্পী মিতা হক, যাঁর কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান পেয়েছিল অনন্য মাধুর্য, শুদ্ধতা এবং গভীর শিল্পবোধের প্রকাশ। তাঁর সংগীতচর্চা ছিল দীর্ঘ সাধনার ফল, যেখানে আবেগ ও শাস্ত্রীয় অনুশীলনের এক পরিপূর্ণ সমন্বয় দেখা যায়।
মিতা হক দীর্ঘদিন বাংলাদেশ বেতারের সর্বোচ্চ গ্রেডের তালিকাভুক্ত শিল্পী হিসেবে সুনামের সঙ্গে সংগীত পরিবেশন করেছেন। তাঁর এককভাবে প্রকাশিত মোট ২৪টি গীতি অ্যালবাম রয়েছে, যার মধ্যে ১৪টি ভারত থেকে এবং ১০টি বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত হয়। এই বিস্তৃত প্রকাশনা তাঁর শিল্পীসত্তার গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ বহন করে।
তিনি ১৯৬২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর সংগীতজীবনের সূচনা ঘটে পারিবারিক পরিবেশেই। প্রথমদিকে তিনি তাঁর চাচা ওয়াহিদুল হকের কাছে গান শেখেন। পরবর্তীতে ওস্তাদ মোহাম্মদ হোসেন খান এবং অধ্যাপক সনজীদা খাতুনের তত্ত্বাবধানে তাঁর সংগীতচর্চা আরও গভীর ও পরিপূর্ণ রূপ লাভ করে। ১৯৭৬ সাল থেকে তিনি নিয়মিতভাবে শাস্ত্রীয় সংগীতের তালিম গ্রহণ শুরু করেন, যা তাঁর রবীন্দ্রসঙ্গীত পরিবেশনাকে আরও পরিশীলিত ও সমৃদ্ধ করে।
মাত্র ১১ বছর বয়সে তিনি জার্মানির বার্লিনে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক শিশু উৎসবে অংশগ্রহণ করেন, যা তাঁর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রতিভা প্রদর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়। এই অংশগ্রহণ তাঁর সংগীতজীবনের প্রাথমিক সাফল্যের একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।
শিল্পী হিসেবে তাঁর পরিচয়ের পাশাপাশি মিতা হক ছিলেন একজন সংগঠক ও শিক্ষক। তিনি “সুরতীর্থ” নামে একটি সংগীত বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করেন। এছাড়া তিনি ছায়ানট সংগীত বিদ্যায়তনের রবীন্দ্রসঙ্গীত বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদের সহসভাপতি হিসেবেও যুক্ত ছিলেন। সংগীত শিক্ষা ও প্রসারে তাঁর অবদান ছিল সুদূরপ্রসারী।
তিনি বিভিন্ন সময়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সম্মাননা লাভ করেন। ২০১৬ সালে তিনি শিল্পকলা পদকে ভূষিত হন। একই বছরে বাংলা একাডেমি তাঁকে রবীন্দ্র পুরস্কারে সম্মানিত করে। এছাড়া “রবি-চ্যানেল আই রবীন্দ্রমেলা”য় তাঁকে বিশেষ সম্মাননাও প্রদান করা হয়। এই স্বীকৃতিগুলো তাঁর দীর্ঘ শিল্পীজীবনের মর্যাদা ও অবদানের প্রতিফলন।
ব্যক্তিজীবনে তিনি প্রখ্যাত নাট্যব্যক্তিত্ব ও অভিনেতা খালেদ খানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁদের একমাত্র কন্যা ফারহিন খান জয়িতা। পারিবারিক জীবনের পাশাপাশি তিনি সংগীতচর্চা ও শিক্ষাদানে সমানভাবে নিবেদিত ছিলেন।
মিতা হকের কণ্ঠ ভৌগোলিক সীমা অতিক্রম করে দুই বাংলার শ্রোতাদের হৃদয়ে স্থান করে নেয়। তাঁর গানের মাধ্যমে রবীন্দ্রসঙ্গীতের ভাব ও সৌন্দর্য নতুনভাবে প্রকাশ পেয়েছে, যা আজও শ্রোতাদের কাছে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
২০২১ সালের ১১ এপ্রিল ক্যান্সারের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াই শেষে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর প্রয়াণে বাংলা সংগীতজগতে এক অপূরণীয় শূন্যতা সৃষ্টি হয়, তবে তাঁর সৃষ্টিকর্ম, শিক্ষা ও সংগীত-উত্তরাধিকার আজও বহমান।
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| জন্ম | ৬ সেপ্টেম্বর ১৯৬২ |
| প্রথম সংগীত শিক্ষা | চাচা ওয়াহিদুল হক |
| পরবর্তী গুরু | ওস্তাদ মোহাম্মদ হোসেন খান, সনজীদা খাতুন |
| আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণ | ১১ বছর বয়সে বার্লিন শিশু উৎসব |
| অ্যালবাম সংখ্যা | মোট ২৪টি (ভারত ১৪টি, বাংলাদেশ ১০টি) |
| প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান | সুরতীর্থ সংগীত বিদ্যালয় |
| পদ ও দায়িত্ব | ছায়ানট রবীন্দ্রসঙ্গীত বিভাগ প্রধান, রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ সহসভাপতি |
| গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার | শিল্পকলা পদক (২০১৬), রবীন্দ্র পুরস্কার (বাংলা একাডেমি) |
| মৃত্যু | ১১ এপ্রিল ২০২১ |
মিতা হকের সংগীতজীবন বাংলা রবীন্দ্রসঙ্গীতের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
মন্তব্য