মার্কিন অবরোধ উপেক্ষা করে হরমুজ পার হলো ইরানি জাহাজ

যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত কঠোর নৌ-অবরোধ উপেক্ষা করে আন্তর্জাতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি সফলভাবে অতিক্রম করেছে ইরানের অপরিশোধিত তেলবাহী চারটি বিশালাকার ট্যাংকার জাহাজ। ২০২৬ সালের ১ জুন (সোমবার) এই জাহাজগুলো হরমুজ প্রণালি পাড়ি দিতে সক্ষম হয়। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর ৪ জুন (বৃহস্পতিবার) প্রকাশিত একটি বিশেষ প্রতিবেদন থেকে এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি নিশ্চিত হওয়া গেছে। সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির প্রেক্ষাপটে এই ঘটনাকে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

কেপ্লারের তথ্য ও ট্র্যাকিং বিশ্লেষণ

সামুদ্রিক জাহাজ চলাচল ও বৈশ্বিক জ্বালানি সংক্রান্ত তথ্য পর্যবেক্ষণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘কেপ্লার’ (Kpler) এই ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানিয়েছে যে, চলতি বছরের ১৫ এপ্রিলের পর এবারই প্রথমবারের মতো ইরানের নিজস্ব পতাকাবাহী কোনো বাণিজ্যিক বা জ্বালানি জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদে অতিক্রম করতে সক্ষম হলো। কেপ্লারের সংগৃহীত উপগ্রহ চিত্র ও সামুদ্রিক ট্র্যাকিং তথ্যানুযায়ী, হরমুজ প্রণালি পার হওয়া ইরানের এই চারটি সুনির্দিষ্ট ট্যাংকার জাহাজ হলো যথাক্রমে—‘হিলদা ওয়ান’ (Hilda 1), ‘দ্য আম্বার’ (The Amber), ‘দ্য সিলভিয়া ওয়ান’ (The Silvia 1) এবং ‘হেপিনেস ওয়ান’ (Happiness 1)।

সংস্থাটির কারিগরি হিসাব অনুযায়ী, এই চারটি তেলবাহী ট্যাংকার জাহাজ সম্মিলিতভাবে প্রায় ৭০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেল বহন করছিল। কেপ্লার তাদের বিশদ প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করেছে যে, এই বছরের এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময়ে উক্ত ট্যাংকার জাহাজগুলোতে জ্বালানি তেল বোঝাই (লোড) করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছিল। তেল বোঝাইয়ের এই কাজটি সম্পন্ন হয় ইরানের মূল ভূখণ্ডের অন্তর্গত কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘খার্গ দ্বীপে’ (Kharg Island)। ভৌগোলিকভাবে এই দ্বীপটি ইরানের জ্বালানি অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি অঞ্চল, কারণ ইরানের মোট আন্তর্জাতিক তেল রপ্তানি ও ট্রানজিটের প্রায় ৯০ শতাংশ কার্যক্রম এই একক দ্বীপটি ব্যবহার করেই পরিচালনা করা হয়ে থাকে।

ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রেখে প্রণালি পারাপার

আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি বাণিজ্যিক ও পণ্যবাহী জাহাজে স্বয়ংক্রিয় তথ্য ব্যবস্থা বা ‘এআইএস ট্রান্সপন্ডার’ (AIS Transponder) সার্বক্ষণিকভাবে চালু রাখার বাধ্যবাধকতা রয়েছে, যার মাধ্যমে জাহাজের অবস্থান, গতিপথ ও পরিচয় নিশ্চিত করা যায়। তবে কেপ্লারের প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সোমবার যখন ইরানি ট্যাংকার জাহাজগুলো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করছিল, তখন সম্ভাব্য সামরিক হামলা ও শত্রুপক্ষের নজরদারি এড়াতে কৌশলগত কারণে সেগুলোর এআইএস ট্রান্সপন্ডার ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ বা নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়েছিল। ট্রান্সপন্ডার বন্ধ থাকার কারণে জাহাজগুলোর তাৎক্ষণিক অবস্থান সাধারণ ট্র্যাকিং ব্যবস্থায় দৃশ্যমান ছিল না।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি ও নৌ-অবরোধের প্রেক্ষাপট

এই ঘটনার পেছনে গভীর রাজনৈতিক ও সামরিক প্রেক্ষাপট রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, গত এপ্রিল মাসে দীর্ঘ সংঘাতের পর যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে সাময়িকভাবে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তবে ইরানকে নিজেদের শর্ত অনুযায়ী একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে আসতে বাধ্য করার জন্য এবং দেশটির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে সেই সময় থেকেই পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালি সংলগ্ন আন্তর্জাতিক জলসীমায় কঠোর নৌ-অবরোধ আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী (ইউএস নেভি)।

যুক্তরাষ্ট্রের এই একতরফা অর্থনৈতিক ও সামরিক অবরোধ ভেঙে এর আগে ইরানি বন্দর থেকে ছেড়ে যাওয়া এবং ইরানের দিকে আসা একাধিক বেসামরিক ও বাণিজ্যিক জাহাজে মার্কিন নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে সরাসরি সামরিক হামলাও চালানো হয়েছিল। এই ধরনের চরম উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর কড়া নজরদারি ও কঠোর অবরোধ ফাঁকি দিয়ে ৭০ লাখ ব্যারেল তেলসহ ইরানের চারটি বিশাল জাহাজের হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার এই ঘটনাটি ঘটল। এই সফল পারাপারের মাধ্যমে ইরান আন্তর্জাতিক জলপথে নিজেদের বাণিজ্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার সক্ষমতা প্রদর্শন করল।