খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৩ই আগস্ট ২০২৬, ২:৫১ পিএম

গ্রিসে ভয়াবহ দাবানল নিয়ন্ত্রণে অভিযান চালানোর সময় মাঝ আকাশে দুটি হেলিকপ্টারের সংঘর্ষে দুই ক্রু সদস্য নিহত হয়েছেন। রোববার রাজধানী এথেন্স থেকে প্রায় ৬৫ কিলোমিটার পশ্চিমে অ্যাটিকা–বোয়েটিয়া সীমান্তবর্তী এলাকায় এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতদের মধ্যে একজন ডেনমার্কের পাইলট এবং অপরজন গ্রিসের ফায়ার সার্ভিসের সমন্বয় কর্মকর্তা বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।
দাবানল দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় আগুন নিয়ন্ত্রণে স্থলভাগের পাশাপাশি আকাশপথেও ব্যাপক তৎপরতা চালানো হচ্ছিল। সেই অভিযানের অংশ হিসেবেই দুটি হেলিকপ্টার আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করছিল। ঠিক কী পরিস্থিতিতে হেলিকপ্টার দুটি পরস্পরের কাছাকাছি চলে আসে এবং সংঘর্ষ ঘটে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে প্রাথমিকভাবে পাওয়া ভিডিও ফুটেজে একটি হেলিকপ্টারের সঙ্গে অন্যটির প্রোপেলারের সংঘর্ষের দৃশ্য দেখা গেছে বলে জানা গেছে।
সংঘর্ষের পর একটি হেলিকপ্টারে আগুন ধরে যায়। পরে সেটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি গিরিখাতে গিয়ে বিধ্বস্ত হয়। অন্য হেলিকপ্টারটিও ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সেটির ক্রুরা জরুরি পরিস্থিতিতে নিচু গাছপালায় আচ্ছাদিত একটি এলাকায় অবতরণ করতে সক্ষম হন। দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পরপরই উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে অভিযান শুরু করে।
ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, দুর্ঘটনায় জড়িত দুটি হেলিকপ্টারই বেল মডেলের এবং অস্ট্রেলীয় কোম্পানি ম্যাকডার্মট এভিয়েশনের কাছ থেকে লিজ নেওয়া হয়েছিল। দুটি উড়োজাহাজে মোট চারজন ক্রু সদস্য ছিলেন। তাঁদের মধ্যে একটি হেলিকপ্টারের ব্রিটিশ পাইলট এবং গ্রিসের একজন সমন্বয় কর্মকর্তা দুর্ঘটনার পর জীবিত উদ্ধার হন। অন্য হেলিকপ্টারের দুই ক্রুকে প্রথমে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করা হলেও পরে তাঁদের মৃত ঘোষণা করা হয়।
নিহতদের পরিচয় সম্পর্কে প্রাথমিক তথ্য প্রকাশ পেলেও চার ক্রু সদস্যের পূর্ণ নাম আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি। আহত জীবিত দুই সদস্যের শারীরিক অবস্থা নিয়েও বিস্তারিত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। তবে তাঁদের উদ্ধার করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও সহায়তার ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
দুর্ঘটনার পর সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে গ্রিসজুড়ে বেল মডেলের সব হেলিকপ্টারের উড্ডয়ন সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। দেশটির বেসামরিক সুরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, এ ধরনের দুর্ঘটনার পর প্রচলিত নিরাপত্তা প্রোটোকলের অংশ হিসেবেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত শুরু হয়েছে। তদন্তে হেলিকপ্টার দুটির উড্ডয়নপথ, পারস্পরিক অবস্থান, যোগাযোগব্যবস্থা, আবহাওয়া এবং সেই সময়কার অপারেশনাল পরিস্থিতি খতিয়ে দেখা হতে পারে।
এদিকে, চলতি সপ্তাহে গ্রিসের বিভিন্ন এলাকায় একাধিক দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে। তীব্র তাপপ্রবাহ, দীর্ঘস্থায়ী শুষ্ক আবহাওয়া এবং উদ্ভিদে আর্দ্রতার ঘাটতির কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। একই সময়ে ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশেও তীব্র গরম ও দাবানলের ঘটনা দেখা দেওয়ায় অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধার কার্যক্রমে বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
দাবানল মোকাবিলায় হেলিকপ্টার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকা কিংবা সড়কপথে দ্রুত পৌঁছানো সম্ভব নয়—এমন স্থানে হেলিকপ্টারের মাধ্যমে অগ্নিনির্বাপণ কার্যক্রম পরিচালনা করা যায়। আগুনের উৎসের কাছাকাছি গিয়ে পানি বা অন্যান্য অগ্নিনির্বাপণ উপকরণ ফেলার ক্ষেত্রেও এসব উড়োজাহাজ কার্যকর। ফলে চলমান দাবানলের মধ্যে এমন দুর্ঘটনা অগ্নিনির্বাপণ অভিযানের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
বিশেষ করে একই এলাকায় একাধিক হেলিকপ্টার ও অন্যান্য আকাশযান একসঙ্গে কাজ করলে পারস্পরিক সমন্বয় এবং উড্ডয়ন নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আগুনের ধোঁয়া, সীমিত দৃশ্যমানতা, তীব্র বাতাস এবং দুর্গম ভূপ্রকৃতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। তবে বর্তমান দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে এসব কোনো কারণ ভূমিকা রেখেছিল কি না, তা তদন্ত শেষ হওয়ার আগে নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।
মর্মান্তিক এই ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন গ্রিসের প্রধানমন্ত্রী কিরিয়াকোস মিতসোতাকিস। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় তিনি নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান। পাশাপাশি আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করা হয়।
দুর্ঘটনার পর বেল মডেলের হেলিকপ্টারের সাময়িক উড্ডয়ন স্থগিতের সিদ্ধান্তকে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কর্তৃপক্ষের তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না। তদন্তে দুই হেলিকপ্টারের উড্ডয়ন পরিস্থিতি, সংঘর্ষের আগে তাদের অবস্থান, ক্রুদের পারস্পরিক যোগাযোগ এবং সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য উঠে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এদিকে, দাবানল নিয়ন্ত্রণে আকাশপথের সক্ষমতা সাময়িকভাবে সীমিত হলে আগুন নিয়ন্ত্রণের কৌশলেও পরিবর্তন আনতে হতে পারে। তবে স্থানীয় পরিস্থিতি, আগুনের বিস্তার এবং অন্যান্য অগ্নিনির্বাপণ সম্পদের ওপর নির্ভর করে কর্তৃপক্ষ কীভাবে অভিযান পরিচালনা করবে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একই সঙ্গে নিহত দুই ক্রু সদস্যের পরিবারের প্রতি সমবেদনা এবং আহতদের দ্রুত সুস্থতার প্রত্যাশাই এই দুর্ঘটনার পর সবচেয়ে বড় মানবিক আবেদন হয়ে উঠেছে।
মন্তব্য