খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১০ই জুলাই ২০২৬, ৪:২২ পিএম

বন্ধুদের সঙ্গে রাতভর আড্ডা, ঘোরাঘুরি আর আনন্দঘন সময় কাটিয়ে ঢাকায় ফেরার পথে মুহূর্তেই বদলে গেল সবকিছু। মুন্সিগঞ্জের মাওয়া থেকে ফেরার সময় রাজধানীর পোস্তগোলা এলাকায় বুড়িগঙ্গা প্রথম সেতুর ওপর ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন এক তরুণ মোটরসাইকেলচালক। একই ঘটনায় আহত হয়েছেন তাঁর সঙ্গে থাকা আরেক বন্ধু। শুক্রবার ভোরের এই দুর্ঘটনায় নিহতের পরিবার, স্বজন এবং সহকর্মীদের মধ্যে নেমে এসেছে গভীর শোক।
নিহত হুমায়ুন কবির (২৩) রাজধানীর একটি মুদিদোকানে কর্মরত ছিলেন। আহত হয়েছেন তাঁর বন্ধু সোহেল (২২)। তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর অবস্থা বর্তমানে আশঙ্কামুক্ত।
হুমায়ুনের বন্ধু মানিক হাওলাদার জানান, বৃহস্পতিবার রাতে কয়েকজন বন্ধু মিলে ঢাকা থেকে মুন্সিগঞ্জের মাওয়ায় বেড়াতে যান। তাঁদের যাতায়াতের জন্য একটি মাইক্রোবাস এবং দুটি মোটরসাইকেল ব্যবহার করা হয়। সেখানে সবাই একসঙ্গে সময় কাটানোর পাশাপাশি ইলিশ পোলাও খেয়ে ভোরের দিকে রাজধানীর উদ্দেশ্যে রওনা দেন। আনন্দময় সেই ভ্রমণের শেষ অধ্যায় যে এমন মর্মান্তিক হবে, তা কেউ কল্পনাও করেননি।
ফেরার পথে হুমায়ুন একটি মোটরসাইকেল চালাচ্ছিলেন এবং তাঁর পেছনে বসেছিলেন সোহেল। ভোরের দিকে তাঁরা রাজধানীর পোস্তগোলা এলাকায় বুড়িগঙ্গা প্রথম সেতু অতিক্রম করছিলেন। এ সময় পেছন থেকে দ্রুতগতির একটি ট্রাক অথবা কাভার্ড ভ্যান তাঁদের মোটরসাইকেলটিকে সজোরে ধাক্কা দেয় বলে প্রত্যক্ষদর্শী ও তাঁদের সঙ্গে থাকা বন্ধুদের ধারণা। প্রচণ্ড আঘাতে দুজনই মোটরসাইকেল থেকে ছিটকে সড়কে পড়ে গুরুতর আহত হন।
দুর্ঘটনার পর তাঁদের সঙ্গে থাকা বন্ধুরা কোনো সময় নষ্ট না করে দ্রুত উদ্ধারকাজ শুরু করেন। আহত দুই যুবককে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে হুমায়ুন কবিরকে মৃত ঘোষণা করেন। আহত সোহেলকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিয়ে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, তাঁর শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক মো. ফারুক জানান, শুক্রবার সকাল পৌনে ছয়টার দিকে দুই যুবককে হাসপাতালে আনা হয়। চিকিৎসকদের পরীক্ষার পর হুমায়ুনকে মৃত ঘোষণা করা হয়। তাঁর মরদেহ হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
পরিবারের সদস্যরা জানান, হুমায়ুন রাজধানীর কলাবাগান এলাকায় বসবাস করতেন। তাঁর গ্রামের বাড়ি চাঁদপুর জেলার ফরিদগঞ্জ উপজেলায়। বাবা মিজানুর রহমান পাটোয়ারীর সন্তান হুমায়ুন পরিবারের অন্যতম উপার্জনক্ষম সদস্য ছিলেন। তাঁর অকাল মৃত্যুতে পরিবার শুধু একজন প্রিয় সন্তানকেই হারায়নি, হারিয়েছে ভবিষ্যতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অবলম্বনও। সহকর্মী ও প্রতিবেশীদের মধ্যেও শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, দুর্ঘটনায় জড়িত ভারী যানটি ঘটনাস্থল ছেড়ে চলে যায়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ এবং অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে যানবাহনটি শনাক্তের চেষ্টা করছে। ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
বাংলাদেশে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা এখনো সড়ক নিরাপত্তার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হয়। বিশেষ করে গভীর রাত বা ভোরের দিকে মহাসড়ক ও সেতু এলাকায় ভারী যানবাহনের সঙ্গে সংঘর্ষে প্রাণহানির ঘটনা প্রায়ই ঘটে। সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, মোটরসাইকেল চালানোর সময় নির্ধারিত গতিসীমা মেনে চলা, নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা, মানসম্মত হেলমেটসহ প্রয়োজনীয় সুরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহার এবং ভারী যানবাহনের চালকদের সর্বোচ্চ সতর্কতা এমন দুর্ঘটনার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে। একই সঙ্গে সড়ক আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ, যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ এবং দায়িত্বশীল চালনার সংস্কৃতি গড়ে তোলাও দুর্ঘটনা প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল, আনন্দের একটি ভ্রমণও অসতর্কতা কিংবা বেপরোয়া গতির কারণে মুহূর্তের মধ্যে শোকের ঘটনায় পরিণত হতে পারে। তাই সড়কে প্রতিটি যাত্রাই নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সম্পন্ন করার বিকল্প নেই।
মন্তব্য