খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১০ই জুলাই ২০২৬, ৪:১৩ পিএম

কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নের রসুলাবাদ এলাকায় বন্যার পানিতে নৌকাডুবির এক মর্মান্তিক ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছে দুই সহোদর বোন—হাসনাতুল জন্নাত ঝর্ণা (১২) ও জেরিন (৭)। শুক্রবার (১০ জুলাই) সকালে ঘটে যাওয়া এই দুর্ঘটনা পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। দীর্ঘ সময়ের উদ্ধার অভিযানের পর বড় বোন ঝর্ণার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। অন্যদিকে গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হলেও চিকিৎসাধীন অবস্থায় ছোট বোন জেরিনকে আর বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
নিহত দুই শিশু স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল মালেকের কন্যা। পরিবারের সদস্যরা জানান, টানা বৃষ্টিতে সৃষ্ট বন্যার পানিতে শুক্রবার সকালে তাদের বসতবাড়ি প্লাবিত হয়ে পড়ে। পানি দ্রুত বাড়তে থাকায় নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় পরিবার। সেই সময় পরিবারের তিন বোন একটি ছোট নৌকায় করে পাশের উঁচু এলাকায় যাওয়ার চেষ্টা করছিল। কিন্তু মাঝপথে প্রবল স্রোতের মুখে পড়ে নৌকাটি ভারসাম্য হারিয়ে উল্টে যায়।
নৌকা ডুবে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিন বোনই পানিতে তলিয়ে যায়। ঘটনাস্থলের আশপাশে থাকা স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত উদ্ধারকাজে নেমে পড়েন। তাদের চেষ্টায় সাওরিন মনি ও জেরিনকে অচেতন ও আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করে দ্রুত স্থানীয় হাসপাতালে পাঠানো হয়। তবে বড় বোন ঝর্ণা তীব্র স্রোতে ভেসে গিয়ে নিখোঁজ হয়ে পড়ে। খবরটি ছড়িয়ে পড়ার পর পুরো এলাকায় উৎকণ্ঠার সৃষ্টি হয়। স্বজনদের পাশাপাশি অসংখ্য স্থানীয় মানুষ ঘটনাস্থলে জড়ো হয়ে উদ্ধার অভিযানের অগ্রগতি জানতে অপেক্ষা করতে থাকেন।
সংবাদ পেয়ে চকরিয়া ফায়ার সার্ভিসের একটি উদ্ধারকারী দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে অভিযান শুরু করে। বন্যার স্রোত, পানির গভীরতা এবং প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেও উদ্ধারকর্মীরা টানা প্রায় ছয় ঘণ্টা অনুসন্ধান চালান। অবশেষে শুক্রবার দুপুর প্রায় ২টার দিকে ঝর্ণার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
এদিকে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন জেরিনের অবস্থার ক্রমাগত অবনতি হতে থাকে। চিকিৎসকরা তাকে বাঁচানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা চালালেও শুক্রবার দুপুর প্রায় ১টার দিকে তার মৃত্যু হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেন শিশু দুটির বাবা আব্দুল মালেক। একদিনের ব্যবধানে দুই কন্যাকে হারিয়ে পরিবারটি গভীর শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়েছে।
বরইতলী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছালেকুজ্জামান জানান, বন্যার পানিতে পারাপারের সময় প্রবল স্রোতের কারণে নৌকাটি ডুবে যায়। স্থানীয়দের দ্রুত উদ্যোগে দুই শিশুকে জীবিত উদ্ধার করা গেলেও বড় বোন ঝর্ণাকে আর উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। পরে ফায়ার সার্ভিসের দীর্ঘ অনুসন্ধান শেষে তার মরদেহ পাওয়া যায়।
প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে কক্সবাজারের নিম্নাঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে বন্যা ও জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। অনেক গ্রামীণ এলাকায় সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় নৌকাই মানুষের প্রধান যাতায়াতের মাধ্যম হয়ে ওঠে। কিন্তু প্রবল স্রোত, ছোট ও অনিরাপদ নৌযান ব্যবহার এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় এ সময় দুর্ঘটনার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ ও নারীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, দুর্যোগকালে নিরাপদ পারাপারের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পর্যাপ্ত উদ্ধার সরঞ্জাম, দ্রুত উদ্ধারকারী দলের উপস্থিতি এবং জনসচেতনতা বাড়ানো গেলে এ ধরনের প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে বন্যাকবলিত এলাকায় জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র ও নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই হৃদয়বিদারক ঘটনায় রসুলাবাদ এলাকাজুড়ে শোকের আবহ বিরাজ করছে। প্রতিবেশী, স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা নিহত দুই শিশুর পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন। একসঙ্গে দুই সন্তানের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের জন্য নয়, পুরো এলাকার মানুষের জন্যই এক বেদনাদায়ক স্মৃতি হয়ে থাকবে।
মন্তব্য