খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১০ই জুলাই ২০২৬, ২:৪৭ পিএম

বাংলাদেশের কূটনৈতিক এবং রাজনৈতিক ইতিহাসে যে কজন মানুষ নিজেদের কর্ম ও মেধা দিয়ে দেশের নাম উজ্জ্বল করেছেন, তাঁদের মধ্যে স্পিকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী অন্যতম। তিনি একাধারে ছিলেন দক্ষ কূটনীতিবিদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং জাতীয় সংসদের অত্যন্ত সজ্জন ও সফল স্পিকার। বহুমুখী মেভার অধিকারী এই মানুষটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় করতে অনন্য ভূমিকা রেখেছিলেন।
১৯২৮ সালের ১১ নভেম্বর সিলেটের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর জন্ম হয়। তাঁর বাবা আবদুর রশীদ চৌধুরী ছিলেন অবিভক্ত ভারতের কেন্দ্রীয় বিধানসভার সদস্য এবং মা সিরাজুন্নেসা চৌধুরী ছিলেন পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য। পারিবারিকভাবেই তিনি রাজনীতি ও সমাজসেবার পরিবেশ পেয়েছিলেন। সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে শিক্ষাজীবন শেষ করে ১৯৪৮ সালে তিনি আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি ইংল্যান্ডে যান এবং লন্ডনের বিখ্যাত ইনার টেম্পল থেকে আইনশাস্ত্রে ডিগ্রি নেন। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রতি আগ্রহ থেকে তিনি লন্ডন ইনস্টিটিউট অব ওয়ার্ল্ড অ্যাফেয়ার্স এবং পরবর্তী সময়ে আমেরিকার ফ্লেচার স্কুল অব ল’ অ্যান্ড ডিপ্লোম্যাসি থেকেও উচ্চতর ডিগ্রি লাভ করেন।
শিক্ষাজীবন শেষে ১৯৫৩ সালে তিনি পাকিস্তান ফরেন সার্ভিসে যোগ দেন। এর মাধ্যমে শুরু হয় তাঁর বর্ণাঢ্য কূটনৈতিক ক্যারিয়ার। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি রোম, বাগদাদ, প্যারিস, লিসবন এবং জাকার্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক মিশনে কাজ করে নিজের মেধার স্বাক্ষর রাখেন।
১৯৭১ সালে যখন বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়, তখন তিনি নতুন দিল্লির পাকিস্তান হাইকমিশনে কর্মরত ছিলেন। দেশের এই সংকটে তিনি পাকিস্তানের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ না করে মাতৃভূমির টানে নিজের জীবন বাজি রাখেন। ১৯৭১ সালের ৪ অক্টোবর তিনি তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের চাকরি বর্জন করে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে যোগ দেন। নতুন দিল্লিতেই তিনি বাংলাদেশ মিশনের প্রধান হিসেবে কাজ শুরু করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে বিশ্ববাসীর কাছে বাংলাদেশের অধিকারের কথা তুলে ধরা এবং স্বাধীনতার পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত ও স্বীকৃতি আদায়ে তাঁর অবদান ছিল অপরিসীম। বিশেষ করে ভারতের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও বুদ্ধিজীবী সমাজকে বাংলাদেশের পক্ষে সংগঠিত করতে তিনি দিনরাত পরিশ্রম করেছেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর তাঁর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানাকে জার্মানির বন শহরে নিজের সরকারি বাসভবনে আশ্রয় দিয়ে তিনি যে অসীম সাহসের পরিচয় দিয়েছিলেন, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ঘটনা।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী জার্মানি, সৌদি আরব এবং যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে অত্যন্ত সফলতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। দেশের পররাষ্ট্র সচিবের দায়িত্বও তিনি দক্ষতার সাথে সামলান। ১৯৮৫ সালে তিনি সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিযুক্ত হন। তাঁর কূটনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় ও ঐতিহাসিক সাফল্য আসে ১৯৮৬ সালে। সে বছর তিনি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হন। প্রথম এবং একমাত্র বাংলাদেশী হিসেবে এই গৌরব অর্জন করে তিনি বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের মর্যাদাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান।
কূটনীতির গণ্ডি পেরিয়ে তিনি দেশের মূলধারার রাজনীতিতেও সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। ১৯৮৬ এবং ১৯৮৮ সালে তিনি সিলেট থেকে জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে তিনি পুনরায় সংসদ সদস্য হন এবং সর্বসম্মতিক্রমে জাতীয় সংসদের স্পিকার নির্বাচিত হন। সংসদ পরিচালনায় তিনি যে নিরপেক্ষতা, ধৈর্য ও শালীনতার পরিচয় দিয়েছিলেন, তা আজও দেশের সংসদীয় ইতিহাসে উদাহরণ হিসেবে গণ্য করা হয়। দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে সংসদের মর্যাদা রক্ষা করার কারণে তিনি সবার কাছে সমানভাবে গ্রহণযোগ্য ও জনপ্রিয় ছিলেন।
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৮৪ সালে আমেরিকার উইলিয়াম অ্যান্ড মেরি বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে মর্যাদাপূর্ণ ‘মহাত্মা গান্ধী শান্তি পুরস্কার’ প্রদান করে। এছাড়া তিনি বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম শীর্ষ গবেষণা প্রতিষ্ঠান লন্ডনের ‘ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ’-এর সম্মানিত সদস্য ছিলেন।
২০০১ সালের ১০ জুলাই এই মহান দেশপ্রেমিক ও প্রজ্ঞাবান রাষ্ট্রনায়ক ঢাকায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর পর তাঁর শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী তাঁকে সিলেটের হযরত শাহজালাল (র.)-এর মাজার সংলগ্ন কবরস্থানে সমাহিত করা হয়। বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় এবং বিশ্ব দরবারে দেশের গৌরব অক্ষুণ্ণ রাখতে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী যে অবদান রেখে গেছেন, তা আগামী প্রজন্মের জন্য চিরকাল অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
মন্তব্য