খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১০ই জুলাই ২০২৬, ৪:৩৭ পিএম

ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানিয়েছেন, আগামী ডিসেম্বরে ভারত থেকে বাংলাদেশে ফিরে আদালতের কাছে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনা করছেন তিনি। তাঁর দাবি, আওয়ামী লীগের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতাও একই সিদ্ধান্তে সম্মত হয়েছেন এবং তাঁর সঙ্গে দেশে ফিরতে আগ্রহী। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে তিনি এ তথ্য জানান।
বৃহস্পতিবার রাতে নেওয়া সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে শুক্রবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে শেখ হাসিনার বক্তব্য তুলে ধরা হয়। সেখানে তিনি বলেন, দেশে ফিরলে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে এবং নিজের নিরাপত্তা নিয়েও তিনি শঙ্কিত। তবু তিনি বাংলাদেশে ফিরতে চান। তাঁর ভাষায়, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের ওপর দমন-পীড়ন চলছে বলে তিনি বিশ্বাস করেন। জীবনের শেষ পরিণতি যদি অনিবার্য হয়, তবে সেটি নিজের দেশেই হতে চান।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। সেই আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটে এবং তিনি ভারত চলে যান। এরপর তাঁর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়। গত নভেম্বরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেন। একই সময়ে আওয়ামী লীগ এবং দলটির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর রাজনৈতিক কার্যক্রমও নিষিদ্ধ করা হয়।
সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, তিনি ও তাঁর দলের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা স্বেচ্ছায় দেশে ফিরে আদালতের মুখোমুখি হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁর মতে, আদালতে আত্মসমর্পণের মাধ্যমে বিচারিক প্রক্রিয়া কতটা স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও আইনের শাসনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে পরিচালিত হচ্ছে, সেটিও জনগণের সামনে স্পষ্ট হবে।
বাংলাদেশ সরকার এর আগে একাধিকবার ভারতের কাছে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানিয়েছে। বিষয়টি দুই দেশের কূটনৈতিক আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ একটি ইস্যু হিসেবেও উঠে এসেছে। তবে শেখ হাসিনার দাবি, দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তিনি কোনো বিদেশি সরকারের সঙ্গে আলোচনা করেননি। তাঁর ভাষ্য, তাঁকে বাংলাদেশে পাঠানোর জন্য ভারতের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে বলে তিনি শুনেছেন, কিন্তু তিনি নিজ উদ্যোগেই দেশে ফিরে আদালতের সম্মুখীন হতে চান।
ভারতে যাওয়ার পর এই প্রথমবার শেখ হাসিনা প্রকাশ্যে দেশে ফেরার একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার কথা উল্লেখ করলেন। ফলে তাঁর এই ঘোষণা দেশের রাজনীতি ও আইন অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক অস্থিরতার পর বর্তমান সরকার যখন প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে, তখন শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক ও উত্তেজনার কারণ হতে পারে। একই সঙ্গে তাঁর ঘোষিত আত্মসমর্পণের পরিকল্পনা বিচারিক প্রক্রিয়া, রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে নতুন প্রশ্নও সামনে আনতে পারে।
এদিকে একই মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতাদের একজন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। তবে শেখ হাসিনার সঙ্গে দেশে ফেরার বিষয়ে তাঁর কিংবা দলের অন্য জ্যেষ্ঠ নেতাদের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। রয়টার্স জানায়, এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের একাধিক নেতার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁদের কাছ থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে শেখ হাসিনার বক্তব্য সম্পর্কে জানতে সংশ্লিষ্ট সরকারি মুখপাত্রদের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয়েছিল। তবে প্রতিবেদন প্রকাশ পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি।
পর্যবেক্ষকদের মতে, শেখ হাসিনার ঘোষিত পরিকল্পনা বাস্তবে কার্যকর হবে কি না, তা নির্ভর করবে নিরাপত্তা পরিস্থিতি, বিচারিক প্রক্রিয়া, প্রশাসনিক প্রস্তুতি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ওপর। ফলে ডিসেম্বরে তাঁর সম্ভাব্য দেশে ফেরা এবং আত্মসমর্পণের ঘোষণা এখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের অন্যতম আলোচিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
মন্তব্য