দেশের বীমা খাতে স্বচ্ছতা ও জনসাধারণের আস্থা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রবর্তিত ‘আইডিআরএ ইন্স্যুরেন্স এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড ২০২৫’ নিয়ে দানা বেঁধেছে নতুন বিতর্ক। গত কয়েক বছর ধরে গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সূচকগুলোতে ধারাবাহিক অবনতি হওয়া সত্ত্বেও গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স পিএলসি-কে এই সম্মানজনক পুরস্কারের জন্য মনোনীত করেছে খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। আগামী ২৯ জানুয়ারি এক আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির হাতে এই পুরস্কার তুলে দেওয়ার কথা রয়েছে। তবে কোম্পানিটির বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্যের সঙ্গে এই ‘এক্সিলেন্স’ বা শ্রেষ্ঠত্বের সংজ্ঞার বৈপরীত্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্ট খাতের বিশ্লেষকরা।
অবনতিশীল আর্থিক চিত্রের চুলচেরা বিশ্লেষণ
গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্সের গত কয়েক বছরের আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, কোম্পানিটির প্রিমিয়াম সংগ্রহ থেকে শুরু করে বিনিয়োগ এবং সলভেন্সি মার্জিন—সবই নিম্নমুখী। বিশেষ করে ২০২৪ সালে কোম্পানিটির গ্রস প্রিমিয়াম সংগ্রহ পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় প্রায় ৯.৬১ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। অবাক করার মতো বিষয় হলো, যখন কোনো কোম্পানির বীমা দাবি পরিশোধের হার বা ‘ক্লেইম রেশিও’ কমে যায়, তখন সাধারণত তাদের আন্ডাররাইটিং মুনাফা বৃদ্ধি পাওয়ার কথা। কিন্তু গ্রীন ডেল্টার ক্ষেত্রে ঘটেছে ঠিক উল্টোটি; তাদের বীমা দাবি পরিশোধ কমলেও আন্ডাররাইটিং প্রোফিট বা অবলিখন মুনাফায় বড় ধস নেমেছে।
নিচে কোম্পানিটির গত কয়েক বছরের আর্থিক অবস্থার একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:
| আর্থিক সূচক | ২০২৪ সাল (কোটি টাকা) | ২০২৩/২০২১ সাল (কোটি টাকা) | পরিবর্তনের হার |
| গ্রস প্রিমিয়াম সংগ্রহ | ৪১০.৮০ | ৪৫৪.৫০ (২০২৩) | ৯.৬১% (হ্রাস) |
| আন্ডাররাইটিং প্রোফিট | ৯৬.৯০ | ১২০.৩০ (২০২১) | ৭.৭১% (হ্রাস) |
| মোট বিনিয়োগ | ৩৬৫.৮০ | ৪১৬.৭০ (২০২৩) | ১২.২২% (হ্রাস) |
| সলভেন্সি মার্জিন (AS) | ১৪৯.২০ | ২০৬.৫০ (২০২৩) | ২৭.৭৫% (হ্রাস) |
| মোট রিজার্ভ | ৩৬৫.৮০ | ৪১৬.৭০ (২০২৩) | ১২.২২% (হ্রাস) |
পুরস্কারের যৌক্তিকতা নিয়ে সংশয়
আইডিআরএ-র বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, সুশাসন পর্যালোচনা ও বিভিন্ন সূচকে ‘অসাধারণ পারফরম্যান্স’-এর ভিত্তিতে মোট ১৩টি প্রতিষ্ঠানকে এই পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে। নন-লাইফ বীমা খাতে গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স চতুর্থ স্থান অধিকার করেছে। তবে আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, এক বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটির বিনিয়োগ এবং রিজার্ভ উভয়ই ৫০ কোটি টাকার বেশি কমে গেছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো সলভেন্সি মার্জিন বা দায় পরিশোধের সক্ষমতা কমে যাওয়া, যা বীমা গ্রাহকদের দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তার জন্য একটি বড় ঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত হয়।
নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও কোম্পানির নিরবতা
এই অসামঞ্জস্যপূর্ণ হিসাব এবং পুরস্কারের মনোনয়ন প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে আইডিআরএ-র মুখপাত্রের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। একইভাবে, গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স পিএলসি-র মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা চৌধুরীকেও ফোন ও ক্ষুদে বার্তার মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যখন একটি প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ এবং সলভেন্সি মার্জিন ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে, তখন তাকে ‘এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড’ প্রদান করা বীমা খাতের সাধারণ গ্রাহকদের কাছে ভুল বার্তা পাঠাতে পারে। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পুরস্কারের মানদণ্ড এবং কোম্পানিগুলোর প্রকৃত আর্থিক সক্ষমতা যাচাই করা জরুরি।
