রোববার (৩১ মে) রাতের আকাশে দেখা যেতে যাচ্ছে বিরল মহাজাগতিক ঘটনা ‘ব্লু মুন’। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে বাংলাদেশসহ এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলের কোটি কোটি মানুষ এই বিশেষ পূর্ণিমার দৃশ্য পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন। মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ বিরতির পর আবারও আকাশে দেখা মিলছে এই বিরল জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘটনার।
জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘ব্লু মুন’ নামটি শুনে চাঁদকে নীল রঙের মনে হলেও বাস্তবে চাঁদের রঙে কোনো পরিবর্তন ঘটে না। এটি স্বাভাবিক রূপালি-সাদা বা কখনও সোনালি আভাযুক্ত চেহারাতেই দেখা যায়। সাধারণত একটি ইংরেজি ক্যালেন্ডার মাসে দুটি পূর্ণিমা সংঘটিত হলে দ্বিতীয় পূর্ণিমাকে ‘ব্লু মুন’ বলা হয়। এ ধরনের ঘটনা খুব ঘন ঘন ঘটে না বলেই এটি বিশেষ গুরুত্ব পেয়ে থাকে।
চাঁদের একটি পূর্ণ আবর্তন বা সিনোডিক মাসের দৈর্ঘ্য প্রায় ২৯ দশমিক ৫ দিন। ফলে ক্যালেন্ডার ও চন্দ্রচক্রের সময়গত পার্থক্যের কারণে প্রতি দুই থেকে তিন বছর পরপর এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা উল্লেখ করেছেন, ১৯ বছরের একটি চক্রে সর্বোচ্চ সাতবার ব্লু মুন দেখা যেতে পারে।
ঐতিহাসিকভাবে ‘ব্লু মুন’ শব্দবন্ধটি বিরল বা অস্বাভাবিক ঘটনা বোঝাতে ব্যবহৃত হতো। পরে জ্যোতির্বিজ্ঞানের পরিভাষায় এটি বিশেষ ধরনের পূর্ণিমাকে নির্দেশ করতে শুরু করে। তবে পৃথিবীর ইতিহাসে এমন ঘটনাও ঘটেছে, যখন চাঁদ সত্যিকার অর্থেই নীলাভ দেখিয়েছে। ১৮৮৩ সালে ইন্দোনেশিয়ার ক্রাকাতোয়া আগ্নেয়গিরির ভয়াবহ অগ্ন্যুৎপাতের পর বায়ুমণ্ডলে বিপুল পরিমাণ ধূলিকণা ও সালফার ছড়িয়ে পড়ায় পৃথিবীর বিভিন্ন স্থান থেকে চাঁদকে নীলাভ রঙে দেখা গিয়েছিল।
এবারের ব্লু মুনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, এটি একই সঙ্গে একটি ‘মাইক্রো মুন’। চাঁদ যখন তার উপবৃত্তাকার কক্ষপথে পৃথিবী থেকে সবচেয়ে দূরবর্তী অবস্থানের কাছাকাছি থাকে এবং সেই সময় পূর্ণিমা সংঘটিত হয়, তখন তাকে মাইক্রো মুন বলা হয়। ফলে চাঁদকে স্বাভাবিক পূর্ণিমার তুলনায় কিছুটা ছোট দেখায়।
ব্লু মুন ও মাইক্রো মুনের প্রধান তথ্য
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| মহাজাগতিক ঘটনা | ব্লু মুন |
| তারিখ | ৩১ মে |
| বিশেষ বৈশিষ্ট্য | একই সঙ্গে মাইক্রো মুন |
| পৃথিবী থেকে দূরত্ব | প্রায় ৪,০৬,০৯৩ কিলোমিটার |
| চাঁদের গড় দূরত্ব | প্রায় ৩,৮৪,৪০০ কিলোমিটার |
| দৃশ্যমান আকার | সাধারণ পূর্ণিমার তুলনায় প্রায় ১০% ছোট |
| পর্যবেক্ষণের উপায় | খালি চোখে নিরাপদে দেখা সম্ভব |
| সর্বশেষ ব্লু মুন | আগস্ট ২০২৩ |
| পরবর্তী ব্লু মুন | ৩১ ডিসেম্বর ২০২৮ |
বিজ্ঞানীদের মতে, ২০২৬ সালের মধ্যে এটিই সবচেয়ে দূরবর্তী পূর্ণিমা। পৃথিবী থেকে দূরত্ব বেশি হওয়ায় চাঁদের দৃশ্যমান ব্যাস সাধারণ পূর্ণিমার তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ ছোট বলে মনে হতে পারে। যদিও এই পার্থক্য সাধারণ দর্শকের পক্ষে খালি চোখে সহজে বোঝা কঠিন।
আমেরিকা ও ইউরোপের কিছু অঞ্চলে ৩০ মে রাতেই চাঁদকে প্রায় পূর্ণ অবস্থায় দেখা গেলেও বাংলাদেশসহ এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ৩১ মে রাতেই এটি সবচেয়ে উজ্জ্বল ও পূর্ণ অবস্থায় দৃশ্যমান হবে। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এই দৃশ্য উপভোগের জন্য কোনো বিশেষ দূরবীক্ষণ যন্ত্র, চশমা বা নিরাপত্তা সরঞ্জামের প্রয়োজন নেই; খালি চোখেই এটি নিরাপদে দেখা যাবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চাঁদ যখন সন্ধ্যায় দিগন্তের কাছাকাছি অবস্থান করবে, তখন বায়ুমণ্ডলের ঘন স্তরের কারণে এটি কমলা বা সোনালি আভা ধারণ করতে পারে। ফলে আকাশ পর্যবেক্ষণ ও আলোকচিত্র ধারণের জন্য সময়টি উপযোগী হতে পারে। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা আরও জানিয়েছেন, আজকের এই ব্লু মুনের পর আগামী ২০২৮ সালের ৩১ ডিসেম্বরের আগে পৃথিবীর আকাশে আর কোনো ব্লু মুন দেখা যাবে না। ফলে ২০২৬ সালের এই বিরল ব্লু মুন ও মাইক্রো মুনের সমন্বয় জ্যোতির্বিজ্ঞানপ্রেমীদের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য পর্যবেক্ষণ সুযোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
