খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২০ই জুন ২০২৬, ১১:৫৫ পিএম

ভোলা জেলার চরফ্যাশন উপজেলায় পৈতৃক সম্পত্তির অধিকার ও বণ্টন নিয়ে বিরোধের জেরে মৃত বাবার দাফনের স্থান নির্ধারণকে কেন্দ্র করে সন্তানদের মধ্যে দফায় দফায় বাগবিতণ্ডা, ধস্তাধস্তি এবং হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে। এই অনাকাঙ্ক্ষিত পারিবারিক কলহের কারণে পারিবারিক কবরস্থান এবং বাড়ির উঠানে দুই দফায় পৃথক দুটি কবর খোঁড়া হলেও দীর্ঘ কয়েক ঘণ্টা ধরে মৃত ব্যক্তির দাফন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ আটকে থাকে।
শনিবার (২০ জুন) সকালের দিকে উপজেলার শশীভূষণ থানার রসুলপুর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত জলিল পণ্ডিতের বাড়িতে এই চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি ঘটে। পরবর্তীতে স্থানীয় থানা পুলিশ এবং জনপ্রতিনিধিদের দীর্ঘ মধ্যস্থতায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে দুপুর ১২টার দিকে জানাজা সম্পন্ন করে মরদেহ দাফন করা হয়। এর আগে, গত শুক্রবার রাতে জলিল পণ্ডিত নিজ বাসভবনে মৃত্যুবরণ করেন।
Table of Contents
স্থানীয় বাসিন্দা এবং পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, মৃত জলিল পণ্ডিত তাঁর জীবদ্দশায় মোট চারটি বিবাহ করেছিলেন। বর্তমানে তাঁর চার স্ত্রীর মধ্যে দুই স্ত্রী জীবিত রয়েছেন এবং তাঁর সংসারে সর্বমোট সাতজন সন্তান রয়েছেন। জলিল পণ্ডিত জীবিত থাকা অবস্থায় তাঁর অর্জিত সম্পত্তির একটি বড় এবং উল্লেখযোগ্য অংশ ছোট স্ত্রীর কন্যাসন্তান খাদিজা আক্তার স্মৃতির নামে আইনগতভাবে দলিল সম্পাদন করে দিয়ে যান।
এই সম্পত্তি বণ্টন এবং জমি হস্তান্তরের বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে পরিবারের অন্য স্ত্রীদের সন্তানদের মধ্যে চরম ক্ষোভ, অসন্তোষ এবং গভীর বিরোধ চলে আসছিল। গত শুক্রবার রাতে জলিল পণ্ডিতের মৃত্যুর পর সম্পত্তি সংক্রান্ত এই দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত বিরোধটি নতুন করে সামনে আসে এবং বাবার শেষকৃত্য তথা দাফনের স্থান নির্বাচন নিয়ে সন্তানদের মধ্যে তীব্র আপত্তি ও জটিলতার সৃষ্টি হয়।
পারিবারিক সূত্র জানায়, জলিল পণ্ডিতের মৃত্যুর পর শনিবার সকালে প্রথা অনুযায়ী প্রথমে বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে তাঁর মরদেহ দাফনের জন্য একটি কবর খোঁড়া হয়েছিল। কিন্তু সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত অন্য সন্তানরা ওই নির্দিষ্ট স্থানে বাবার মরদেহ দাফন করার বিষয়ে তীব্র আপত্তি প্রকাশ করে কাজে বাধা প্রদান করেন। কবরস্থানে দাফন নিয়ে পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করলে পরিবারের অন্য সদস্যরা বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে বাড়ির উঠানে দ্বিতীয়বারের মতো আরও একটি নতুন কবর খনন করেন।
কিন্তু বাড়ির উঠানের ওই স্থানেও মৃতদেহ দাফন করার বিষয়ে অন্য পক্ষ পুনরায় তীব্র আপত্তি ও প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এই পর্যায়ে মৃত জলিল পণ্ডিতের মরদেহ বাড়ির উঠানে ফেলে রেখেই ছোট স্ত্রীর মেয়ে খাদিজা আক্তার স্মৃতির সঙ্গে তাঁর অন্যান্য সৎ ভাই ও বোনদের মধ্যে তীব্র বাদানুবাদ এবং বাগবিতণ্ডা শুরু হয়। উপস্থিত স্থানীয় লোকজনদের সামনেই এই পারিবারিক বিতর্ক একপর্যায়ে চরম রূপ নিয়ে পরস্পরের মধ্যে হাতাহাতি, ধস্তাধস্তি এবং মারমুখী আচরণে রূপ নেয়, যার ফলে দাফন প্রক্রিয়া পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
বাড়ির উঠানে লাশ রেখে সন্তানদের এই মারামারির খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতির খবর পেয়ে শশীভূষণ থানা পুলিশ এবং স্থানীয় রসুলপুর ইউনিয়নের জনপ্রতিনিধিরা দ্রুত দলবলসহ জলিল পণ্ডিতের বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হন।
তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে উত্তেজিত সন্তানদের শান্ত করেন এবং উভয় পক্ষের সাথে সম্পত্তির আইনি বিষয় ও বাবার দাফনের ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনায় বসেন। দীর্ঘ আলোচনার পর উভয় পক্ষের সম্মতি ও সমঝোতার ভিত্তিতে দাফনের স্থান নিয়ে চলমান বিরোধের অবসান ঘটে। পরবর্তীতে দুপুর ১২টার দিকে বাড়ির উঠানেই মৃত জলিল পণ্ডিতের নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয় এবং জানাজা শেষে খননকৃত কবরে তাঁর মরদেহ দাফন করা হয়।
এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা প্রসঙ্গে মৃত জলিল পণ্ডিতের ছোট স্ত্রীর মেয়ে খাদিজা আক্তার স্মৃতি গণমাধ্যমের কাছে ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে জানান, জমি-জমা এবং পৈতৃক সম্পত্তি সংক্রান্ত পূর্ববর্তী বিভিন্ন বিষয়ে তাঁদের ভাই-বোনদের মধ্যে দীর্ঘদিনের পারিবারিক মতবিরোধ ও ক্ষোভ ছিল। যার प्रत्यक्ष কারণে বাবার আকস্মিক মৃত্যুর পর তাঁর দাফনের স্থান নির্ধারণ নিয়ে এক জটিল ও অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তবে পরবর্তীতে পুলিশ প্রশাসন এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের হস্তক্ষেপে বিষয়টি সাময়িকভাবে সমাধান হওয়ার পর তাঁরা বাবার মরদেহ দাফন করতে সক্ষম হয়েছেন।
অন্যদিকে, শশীভূষণ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ফিরোজ আহাম্মদ ঘটনার বিস্তারিত নিশ্চিত করে গণমাধ্যমকে জানান, মৃত ব্যক্তির দাফনের স্থান নির্ধারণকে কেন্দ্র করে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে তীব্র বিরোধ, হট্টগোল ও উত্তেজনা তৈরি হওয়ার খবর পেয়ে পুলিশের একটি দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। পরে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের সক্রিয় সহযোগিতায় উত্তেজিত উভয় পক্ষকে শান্ত করা হয়। উভয় পক্ষের সন্তানদের সাথে দীর্ঘক্ষণ ফলপ্রসূ আলোচনা শেষে শান্তি রক্ষা করে মৃত ব্যক্তির মরদেহ দাফন সম্পন্ন করা হয়েছে এবং বর্তমানে ওই এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রয়েছে।
মন্তব্য