খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৯ই জুলাই ২০২৬, ৩:২৯ পিএম

বাংলা সাহিত্যের ষাটের দশকের অন্যতম বিশিষ্ট কবি, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট সমুদ্র গুপ্তের প্রয়াণ দিবসে তাঁর জীবন ও সৃষ্টির প্রতি গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি। এটি তাঁর সাহিত্যিক ছদ্মনাম হলেও তাঁর আসল নাম ছিল আবদুল মান্নান বাদশা। সহজ, সাবলীল এবং মানবতাবাদী জীবনবোধের অনন্য রূপকার হিসেবে বাংলা কবিতায় তিনি নিজের এক চিরস্থায়ী আসন তৈরি করে গেছেন।
১৯৪৬ সালের ২৩ জুন সিরাজগঞ্জ জেলার রায়গঞ্জ উপজেলার হাসিল গ্রামে এই গুণী কবির জন্ম। ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে তিনি সাহিত্যচর্চায় যুক্ত হন। সমুদ্র গুপ্ত নামেই তিনি মূলত কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, সমালোচনা, নিবন্ধ ও কলাম লিখে বাংলা সাহিত্যে নিজের এক স্বতন্ত্র পথ তৈরি করেন। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘রোদ ঝলসানো মুখ’ প্রকাশিত হয় ১৯৭৭ সালে। পেশাগত জীবনের নানামুখী ব্যস্ততা ও প্রতিকূলতার কারণে শুরুতে তিনি সাহিত্যচর্চায় পুরোপুরি নিমগ্ন হতে না পারলেও পরবর্তী সময়ে অদম্য নিষ্ঠা ও ভালোবাসায় আমৃত্যু সাহিত্যসাধনা অব্যাহত রেখেছিলেন।
কবির জীবনের পথচলা ছিল অত্যন্ত সংগ্রামমুখর ও বহুবর্ণিল। জীবিকার তাগিদে জীবনের বিভিন্ন সময়ে তিনি নানা পেশা বেছে নিয়েছেন। কখনও প্রেসের সাধারণ কর্মচারী, কখনও করাতকলের ম্যানেজার, কখনও জুটমিলের বদলি শ্রমিক, আবার কখনও উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া ওষুধ ও চিকিৎসা-ব্যবসায়ী, প্রুফরিডার কিংবা সাংবাদিক হিসেবেও কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ছিল তাঁর। জীবনের এই নানামুখী ও রুঢ় বাস্তবতা এবং কঠোর অভিজ্ঞতাই তাঁর সাহিত্যকে দিয়েছে গভীর জীবনবোধ, মাটি ও মানুষের কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ এবং অকৃত্রিম মানবিকতার স্পর্শ।
সমুদ্র গুপ্ত ছিলেন আপাদমস্তক আশাবাদী ও প্রগতিশীল মানবতাবাদী চেতনার কবি। তিনি সচেতনভাবেই তাঁর কবিতাকে জটিল ও দুর্বোধ্যতার আবরণ থেকে মুক্ত রেখেছিলেন। সহজ, স্বতঃস্ফূর্ত ও আপন সুরে তিনি পাঠকের হৃদয়ে পৌঁছে দিতে চেয়েছেন বাংলা কবিতার নির্মল রূপ। তথাকথিত আধুনিক কবিতার কৃত্রিম জটিলতা অতিক্রম করে তাঁর এই ‘সহজিয়া’ কাব্যভাষা বাংলা কবিতায় এক গুরুত্বপূর্ণ ও কালজয়ী সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হয়।
তাঁর অনন্য সৃষ্টিশীলতা কেবল দেশের গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। কবি সমুদ্র গুপ্তের কবিতা হিন্দি, উর্দু, অসমিয়া, নেপালি, চীনা, সিংহলি, ফরাসি, ইংরেজি, জাপানি ও নরওয়েজীয়সহ বিশ্বের অন্তত ১০টি বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত ও প্রকাশিত হয়েছে। কবিতায় অসামান্য ও নিরলস অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি দেশ-বিদেশে বহু সম্মাননা, পুরস্কার ও সংবর্ধনায় ভূষিত হয়েছেন।
২০০৮ সালের ১৯ জুলাই বাংলা সাহিত্যের এই নিবেদিতপ্রাণ কবি চিরবিদায় নেন। মৃত্যুর এতদিন পরেও তাঁর সহজ-সুন্দর কাব্যভাষা, অসাম্প্রদায়িক মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং আজীবনের সাহিত্যসাধনা বাংলা সাহিত্যের পাঠকের হৃদয়ে আজও অম্লান। প্রয়াণ দিবসে কবি সমুদ্র গুপ্তের স্মৃতি ও অনন্য সাহিত্যকীর্তি নতুন প্রজন্মের কবি ও লেখকদের অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
মন্তব্য