প্রধানমন্ত্রীর সফর শেষে সড়কের ইট তুলে নেওয়ার ঘটনা

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ী সফরকে কেন্দ্র করে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) কর্তৃক একটি কাঁচা সড়কে সাময়িকভাবে বিছানো ইট ও বালু অপসারণের ঘটনা ঘটেছে। প্রধানমন্ত্রীর যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে স্থানীয় প্রশাসন দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রায় আধা কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কটি চলাচলের উপযোগী করলেও সফর শেষ হতেই তা তুলে নেওয়া হয়। এই ঘটনাটি স্থানীয় বাসিন্দা এবং সচেতন মহলে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

ঘটনার প্রেক্ষাপট ও প্রধানমন্ত্রীর বগুড়া সফর

গত ২০ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বগুড়া জেলায় রাষ্ট্রীয় সফরে আসেন। সফরসূচির অংশ হিসেবে তিনি গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ী শহীদ জিয়া ডিগ্রি কলেজ মাঠে আয়োজিত ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। এর পাশাপাশি তিনি স্থানীয় চৌকিরদহ খাল খননকাজেরও উদ্বোধন ঘোষণা করেন।

এসব আনুষ্ঠানিকতা শেষে প্রধানমন্ত্রী তার পৈতৃক ভিটা জিয়াবাড়ী পরিদর্শনে যান। প্রধানমন্ত্রীর এই পৈতৃক ভিটা পরিদর্শনকে কেন্দ্র করে নশিপুর ইউনিয়ন পরিষদ থেকে চৌকির খাল হয়ে জিয়াবাড়ী পর্যন্ত যাতায়াতের একমাত্র কাঁচা সড়কটি দ্রুত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। রাষ্ট্রীয় অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির নিরাপত্তা ও চলাচল উপযোগী করার লক্ষ্যে এলজিইডি তাৎক্ষণিকভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করে। অত্যন্ত অল্প সময়ের মধ্যে প্রায় ৫০০ মিটার (আধা কিলোমিটার) দৈর্ঘ্যের এই কাঁচা সড়কটিতে ইট বিছিয়ে ও বালু ফেলে সোলিং করে যাতায়াতের উপযোগী করা হয়। তবে প্রধানমন্ত্রীর সফর সম্পন্ন হওয়ার পরপরই সড়ক থেকে বিছানো সব ইট আবার সরিয়ে নেওয়া হয়।

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও সাময়িক বরাদ্দের বিবরণ

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) এবং প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, এটি কোনো স্থায়ী সড়ক নির্মাণ বা সংস্কারের কাজ ছিল না। বরং ভবিষ্যৎ উন্নয়নকাজের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে এবং প্রধানমন্ত্রীর তাৎক্ষণিক যাতায়াত নিশ্চিত করতে এটি একটি সম্পূর্ণ অস্থায়ী ব্যবস্থা ছিল।

সংশ্লিষ্ট প্রকল্প ও কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যের বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো:

  • স্থায়ী প্রকল্প ও বাজেট: নশিপুর ইউনিয়ন পরিষদ থেকে চৌকির খাল হয়ে জিয়াবাড়ী পর্যন্ত ৫০০ মিটার সড়কটি স্থায়ীভাবে পাকাকরণের জন্য আগেই ৮৪ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় সড়কটি কার্পেটিং করার লক্ষ্যে দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজের কার্যাদেশও দেওয়া হয়েছিল।

  • অস্থায়ী সোলিংয়ের ব্যয়: স্থায়ী প্রকল্প অনুমোদিত থাকায় দীর্ঘ মোদে ব্যবহার উপযোগী অবকাঠামো তৈরি না করে, প্রধানমন্ত্রীর যাতায়াতের জন্য সাময়িকভাবে ১০ লাখ টাকা ব্যয়ে ইট ভাড়া নিয়ে বিছানো হয়েছিল।

  • ইট অপসারণের কারণ: এলজিইডির বগুড়া কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাসুদুজ্জামান জানান, সড়কটি স্থায়ীভাবে পাকাকরণের কাজ শুরু করার স্বার্থেই ব্যবহৃত ইটগুলো সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এগুলো ক্রয় করা হয়নি, বরং ভাটাবিল্ডারের কাছ থেকে ভাড়া নেওয়া হয়েছিল। ফলে ইট ফেরত দেওয়ায় সরকারি অর্থের সাশ্রয় হয়েছে এবং মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের স্থায়ী নির্মাণকাজে কোনো বাধা থাকছে না।

  • বাস্তবায়নকারীর বক্তব্য: অস্থায়ী সোলিংয়ের দায়িত্বে থাকা আতিকুর রহমান বলেন, এলজিইডির নির্দেশনা অনুযায়ী ইটভাটা থেকে ইট এনে সড়কে বিছানো হয়েছিল। সফর শেষে তা ভাটায় ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এতে পরিবহন ও শ্রমিক মজুরি ছাড়া অতিরিক্ত কোনো সরকারি অর্থের অপচয় হয়নি।

  • বিলম্বের কারণ: গাবতলী উপজেলা প্রকৌশলী মো. সাজেদুর রহমান জানান, কিছু জায়গায় সীমানাসংক্রান্ত জটিলতা থাকার কারণে মূল প্রকল্পের কাজ শুরু হতে বিলম্ব হয়েছে। বর্তমানে সড়কটির পাশের সুরক্ষামূলক অবকাঠামো নির্মাণ কার্যক্রম এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিমূলক কাজ এগিয়ে চলছে। নির্ধারিত মেয়াদের মধ্যেই টেকসই কার্পেটিংয়ের কাজ সম্পন্ন করার লক্ষ্য রয়েছে কর্তৃপক্ষের।

সচেতন নাগরিক সমাজ ও স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া

প্রধানমন্ত্রী চলে যাওয়ার পর তড়িঘড়ি করে সড়ক থেকে ইট তুলে নেওয়ার এই ঘটনাটি স্থানীয়ভাবে তীব্রভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষ সড়কটি স্থায়ীভাবে পাকাকরণের অপেক্ষায় দিন গুনছিলেন। রাষ্ট্রীয় অতিথির জন্য সড়ক তৈরি করে আবার তা ভেঙে ফেলায় ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন অনেকেই।

নাগরিক সমাজ ও স্থানীয়দের প্রধান পর্যবেক্ষণসমূহ নিম্নরূপ:

খতিয়াননাগরিক সমাজের পর্যবেক্ষণ ও বক্তব্য
আইনগত ভিত্তিসরকারি অর্থায়নে ভাড়া করা সামগ্রী ব্যবহার করে এ ধরনের অস্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণের আইনি বৈধতা ও সরকারি ক্রয় নীতিমালা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সচেতন নাগরিকরা।
সুপ্র-এর ক্ষোভসুশাসনের জন্য প্রশাসন (সুপ্র) বগুড়ার সম্পাদক কে জী এম ফারুক এই প্রক্রিয়ার তীব্র সমালোচনা করে বলেন, একটি কাঁচা সড়ক পাকাকরণের জন্য দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর সেখানে নতুন করে আর কোনো রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয় করার আইনগত সুযোগ নেই। শুধু রাষ্ট্রীয় অতিথির সফরকে কেন্দ্র করে এই ধরনের সাময়িক আর্থিক বরাদ্দ দেওয়া রাষ্ট্রের অর্থের অপচয়।
স্বচ্ছতার প্রশ্নসুপ্র সম্পাদকের দাবি, প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে কেন্দ্র করে তড়িঘড়ি করে কাঁচা সড়কে ইট বিছানো এবং তিনি চলে যাওয়ার পর তা তুলে নেওয়া এক ধরনের ‘ছলচাতুরী’। এই অস্থায়ী কাজে সরকারি যে পরিমাণ অর্থই ব্যয় দেখানো হোক না কেন, তার আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে জনমনে গভীর সংশয় দেখা দেবে।

তবে এলজিইডির প্রকৌশলীরা আশ্বস্ত করেছেন যে, মূল প্রকল্প বাস্তবায়ন শেষ হলে বাগবাড়ী ও জিয়াবাড়ী এলাকার যোগাযোগব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি ও উল্লেখযোগ্য উন্নতি সাধিত হবে। এর ফলে স্থানীয় কৃষিপণ্য পরিবহন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত এবং স্থানীয় বাজারে যাতায়াতের পথ সুগম হবে এবং এলাকাবাসী দীর্ঘ সুফল ভোগ করতে পারবে।