খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ই জুন ২০২৬, ১২:৪৮ এএম

পাবনা জেলায় বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে সমকামিতার হার এবং সেই সাথে এইচআইভি বা এইডস রোগের সংক্রমণ আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। জেলাটিতে এ পর্যন্ত সর্বমোট ১৬ জনের শরীরে এইচআইভি এইডস ভাইরাসের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে, যাদের মধ্যে একটি বড় অংশই সমকামী পুরুষ। পাবনা জেনারেল হাসপাতালে আয়োজিত এক বিশেষ সেমিনার ও কর্মশালায় চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জেলার এই উদ্বেগজনক স্বাস্থ্য পরিস্থিতির তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেছেন।
Table of Contents
গত বুধবার (১৭ জুন, ২০২৬) দুপুরে পাবনা জেনারেল হাসপাতালের সভাকক্ষে ‘বাংলাদেশে মানবাধিকার ও এইচআইভি: গণমাধ্যমের ভূমিকা’ শীর্ষক একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। কর্মশালাটির আয়োজন করে পাবনা জেনারেল হাসপাতালের ‘কি পপুলেশন্স-কেপি সেন্টার’। উক্ত অনুষ্ঠানে জেলার বর্তমান এইচআইভি পরিস্থিতি, সংক্রমণের হার এবং এই রোগ প্রতিরোধে করণীয় সম্পর্কে বিস্তারিত বৈজ্ঞানিক ও পরিসংখ্যানগত তথ্য উপস্থাপন করা হয়।
সেমিনারে পাবনা জেলার সার্বিক এইচআইভি সংক্রান্ত বিভিন্ন জটিল বিষয় স্লাইড ও প্রতিবেদনের মাধ্যমে তুলে ধরেন পাবনা জেনারেল হাসপাতালের কেপি সেন্টারের ফোকাল পার্সন ডা. মনিরুজ্জামান এবং উক্ত সেন্টারের ম্যানেজার ডা. আহসানুল কবির। তাঁদের উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, পাবনা জেলার সাধারণ শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রান্তিক ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে সমকামিতা ও অনিরাপদ শারীরিক সম্পর্কের প্রবণতা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। জেলাটিতে এ পর্যন্ত মোট ১৬ জনের শরীরে এইচআইভি এইডস শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, এই আক্রান্ত ১৬ জনের মধ্যে ৭ জনই হলেন সমকামী জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত।
পাবনা জেনারেল হাসপাতালের কেপি সেন্টারের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের দেওয়া তথ্য ও পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জেলায় মূলত কয়েকটি নির্দিষ্ট ও উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মাধ্যমে এইচআইভি ভাইরাস ছড়াচ্ছে। এই ঝুঁকিপূর্ণ তালিকার মধ্যে রয়েছেন সরাসরি শিরায় মাদক গ্রহণকারী ব্যক্তি, নারী যৌনকর্মী, পুরুষ যৌনকর্মী, সমকামী পুরুষ এবং হিজড়া জনগোষ্ঠী।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের মাঠপর্যায়ের জরিপ ও কেপি সেন্টারের নিয়মিত কার্যক্রমের মাধ্যমে পাবনা জেলায় এ পর্যন্ত ১ হাজার ৬১৫ জন সমকামী ব্যক্তিকে শনাক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ৭৬৫ জন নারী যৌনকর্মী, ৯০৮ জন পুরুষ যৌনকর্মী, ১১০ জন হিজড়া এবং সরাসরি শিরায় সিরিঞ্জের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারী ৪৮৪ জন ব্যক্তিকে সরকারিভাবে শনাক্ত করা হয়েছে। এই বিপুল সংখ্যক ঝুঁকিপূর্ণ মানুষ নিয়মিত অসচেতনভাবে ও অনিরাপদ উপায়ে মেলামেশা এবং মাদক গ্রহণ করার কারণে জেলায় এইচআইভি সংক্রমণের ঝুঁকি দিন দিন আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
পাবনা জেনারেল হাসপাতালে অনুষ্ঠিত এই সচেতনতামূলক কর্মশালায় চিকিৎসার সাথে জড়িত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং জেলার সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যমকর্মীরা অংশ নেন। অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন পাবনা জেনারেল হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. রফিকুল হাসান, পাবনা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি এবিএম ফজলুর রহমান, ক্লাবের কোষাধ্যক্ষ আবুল কালাম আজাদ, পাবনা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক শামসুল আলম এবং কোষাধ্যক্ষ প্রবীর কুমার সাহা।
কর্মশালায় চিকিৎসকেরা উল্লেখ করেন যে, এইচআইভি এইডস প্রতিরোধে কেবল চিকিৎসা ব্যবস্থাই যথেষ্ট নয়, বরং সামাজিক সচেতনতা এবং গণমাধ্যমের জোরালো ভূমিকা অত্যন্ত জরুরি। সমকামিতা ও মাদক গ্রহণের মতো ঝুঁকিপূর্ণ আচরণগুলো থেকে তরুণ সমাজ ও শিক্ষার্থীদের দূরে রাখতে না পারলে জেলাটিতে এইডস পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারে। কেপি সেন্টারের কর্মকর্তারা আক্রান্তদের যথাযথ চিকিৎসাসেবা ও কাউন্সেলিং প্রদানের পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার আওতায় আনার ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করেন।
পাবনা জেনারেল হাসপাতালের কেপি সেন্টার থেকে জানানো হয়েছে যে, এইডস এর বিস্তার রোধে গ্রামীণ ও শহর অঞ্চলে নিয়মিত সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ এবং মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের নজরদারি আরও জোরদার করা হবে।
মন্তব্য