খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ই জুন ২০২৬, ১০:৩৬ পিএম

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই বাংলাদেশ সীমান্ত এবং অবৈধ অভিবাসন ইস্যুটি রাজ্য রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে। গত মে মাসে রাজ্যে নতুন বিজেপি সরকার গঠিত হওয়ার পর থেকে এই বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায়, রাজ্যে থাকা নথিপত্রবিহীন অভিবাসীদের চিহ্নিত করে পুশব্যাক বা নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর একটি বড় ধরনের অভিযান শুরু হয়।
রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ১০ হাজার অবৈধ অভিবাসীকে শনাক্ত করে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। গত মঙ্গলবার (২৩ জুন) রাজ্য বিধানসভার অধিবেশনে বক্তব্য রাখার সময় তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে এই পরিসংখ্যান তুলে ধরেন।
মুখ্যমন্ত্রী বিধানসভাকে অবহিত করেন যে, কেন্দ্রীয় সীমান্তরক্ষা বাহিনী (বিএসএফ) এবং রাজ্য প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন এলাকা থেকে এই বিপুল সংখ্যক নথিপত্রবিহীন ব্যক্তিকে চিহ্নিত করা হয়। এরপর প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে তাদের সীমান্ত পার করে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। অনুপ্রবেশ ঠেকাতে কেবল পুশব্যাকই নয়, রাজ্যের অভ্যন্তরেও কঠোর প্রশাসনিক নজরদারি চালানো হচ্ছে। বর্তমানে রাজ্যের ১২টি ডিটেনশন সেন্টার বা আটক কেন্দ্রে আরও প্রায় ১ হাজার ৮০০ জন অবৈধ অভিবাসী অবস্থান করছেন। তাদেরও পর্যায়ক্রমে এবং দ্রুত আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া সচল রয়েছে।
সীমান্তবর্তী এই রাজ্যে এত বড় আকারের একটি অভিযানের ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের উদ্বেগ তৈরি হতে পারে—এমনটি মাথায় রেখে মুখ্যমন্ত্রী বিধানসভায় দেশের বৈধ নাগরিকদের আশ্বস্ত করেছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, যারা ভারতের বৈধ নাগরিক, তাদের এই অভিযান বা প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিয়ে বিন্দুমাত্র আতঙ্কিত বা উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই।
সরকার কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম, সম্প্রদায় কিংবা রাজনৈতিক পরিচয় দেখে এই পদক্ষেপ নিচ্ছে না। প্রকৃত ভারতীয় নাগরিকদের অধিকার ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বর্তমান প্রশাসন সম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই অভিযানের মূল উদ্দেশ্য কেবলই অবৈধ অনুপ্রবেশ বন্ধ করা এবং রাজ্যের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা।
অবৈধ অনুপ্রবেশের রুটগুলো স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে পশ্চিমবঙ্গ সরকার এখন দীর্ঘমেয়াদি ও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার দিকে এগোচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী তার বক্তব্যে জানান, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের নিরাপত্তা নিশ্ছিদ্র করার অংশ হিসেবে আগামী ছয় মাসের মধ্যে প্রায় ৬০০ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকায় নতুন করে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের কাজ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে।
এই বিশাল অবকাঠামোগত উন্নয়ন কাজ দ্রুত শেষ করতে রাজ্য সরকার ইতোমধ্যে বিএসএফ-এর কাছে ১৪২ দশমিক ৭৯ একর জমি হস্তান্তর করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে আরও দাবি করা হয়েছে, প্রশাসনের কড়া নজরদারি ও উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে সীমান্তবর্তী হিলি-হাকিমপুরের মতো এলাকাগুলো দিয়ে অনেক বাংলাদেশি অভিবাসী কোনো ধরনের বলপ্রয়োগ ছাড়াই স্বেচ্ছায় নিজ দেশে ফিরে গেছেন।
অবৈধ অভিবাসীদের বছরের পর বছর আটক কেন্দ্রে রেখে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থ ব্যয় করার চেয়ে তাদের দ্রুত নিজ দেশে ফেরত পাঠানোকেই বর্তমান সরকারের প্রধান নীতিগত সিদ্ধান্ত হিসেবে উল্লেখ করেছেন শুভেন্দু অধিকারী।
তিনি যুক্তি দেন যে, আটক কেন্দ্রগুলোতে বিপুল সংখ্যক মানুষের দীর্ঘ মেয়াদে ভরণপোষণ, নিরাপত্তা এবং আইনি প্রক্রিয়ার পেছনে প্রতি বছর বিশাল অঙ্কের সরকারি অর্থ ব্যয় হয়। এই পুশব্যাক অভিযানের ফলে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ সাশ্রয় হবে, তা ফেলে না রেখে রাজ্যের বিভিন্ন সামাজিক কল্যাণমূলক প্রকল্প এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে ব্যবহার করা যাবে। প্রশাসন মনে করছে, এই অর্থ বাঁচিয়ে জনকল্যাণমুখী কাজে লাগালে তা স্থানীয় অর্থনীতিতে সরাসরি ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। গত মে মাসে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে নথিপত্রবিহীন অভিবাসীদের শনাক্তকরণ ও ফেরত পাঠানোর এই প্রক্রিয়াকে বর্তমান প্রশাসন তাদের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করছে।
মন্তব্য