নঈম নিজাম
উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের নায়ক তোফায়েল আহমেদের সঙ্গে ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে থাকা আরেক নাম সিরাজুল আলম খানের ছিল গভীর ও দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। এই সম্পর্কের শেকড় প্রোথিত ছিল ষাটের দশকের ছাত্র আন্দোলনে। তোফায়েল আহমেদের নেতৃত্বে উঠে আসার পেছনেও সিরাজুল আলম খানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ছায়া ছিল।
ষাটের দশকে ছাত্রলীগে মূলত দুটি ধারা ছিল। একদিকে সিরাজুল আলম খান, অন্যদিকে শেখ ফজলুল হক মণি। তোফায়েল আহমেদ ছিলেন সিরাজুল আলম খানের ঘনিষ্ঠ। স্বাধীনতার পর রাজনৈতিক মত ও পথের ভিন্নতা তৈরি হলেও তাঁদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক অটুট ছিল। রাজনীতি আর ব্যক্তিগত সম্পর্ককে তাঁরা কখনো গুলিয়ে ফেলেননি।
মনে পড়ে ২০১৭ সালের কথা। তোফায়েল আহমেদ তখন বাণিজ্যমন্ত্রী। এক সন্ধ্যায় বসুন্ধরা থেকে বনানী হয়ে গুলশানে যাওয়ার পথে কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই তোফায়েল আহমেদের বাসায় যাই। ঠিক তখনই একটি গাড়ি বের হয়ে যেতে দেখলাম। গাড়ির আরোহীকে পরিচিত মনে হলো। দেখলাম, তোফায়েল আহমেদ নিজেই তাঁকে বিদায় জানিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। আমাকে দেখে এগিয়ে এলেন।
আমি বললাম, “দাদাকে দেখলাম মনে হলো।”
তিনি বললেন, “হ্যাঁ, ঠিকই দেখেছো। সিরাজ ভাই এসেছিলেন। তাঁর শরীর ভালো নয়। চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাবেন। দেখা করে গেলেন। আমি সব সময় তার পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করি। বিশেষ করে চিকিৎসার সময়।
এরপর তিনি বললেন, “সিরাজ ভাইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা তৈরি, ডাকসু, ছাত্রলীগ, অনেক কিছুতেই সিরাজ ভাইয়ের ভূমিকা ছিল।”
আমি বললাম, “আপনি তো চ্যানেল আইয়ের ‘তৃতীয় মাত্রা’য় এসব বলেছেন। আমি দেখেছি। আমাকেও অনেক সাক্ষাৎকারে বলেছেন। দাদাও আপনাকে অনেক ভালো জানে।
হেসে তিনি বললেন, “সেই বলাটা কাল হয়েছিল। টিভিতে আমার কথাগুলো অনেকে পছন্দ করেনি। তারপরও ইতিহাস তো বলে যেতে হবে।”
এরপর তোফায়েল আহমেদ স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বললেন, “উনসত্তরের সেই দিন, লাখো মানুষের জনসমাবেশে ডাকসুর ভিপি হিসেবে বক্তব্য দিতে উঠেছিলাম। কারামুক্ত শেখ মুজিবুর রহমানকে সংবর্ধনা দেওয়া হচ্ছিল। সিরাজ ভাই আমার হাতে একটি কাগজ দিলেন। তাতে লেখা ছিল—‘প্রিয় নেতা, বাংলার মানুষের জন্য আপনি জীবনের সেরা সময়গুলো কারাগারে কাটিয়েছেন। মানুষের অধিকারের জন্য সংগ্রাম করেছেন। আপনি বাঙালি জাতির বন্ধু, বাংলার বন্ধু, বঙ্গবন্ধু।’”
শব্দটি উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গেই সমাবেশে উপস্থিত লাখো মানুষ উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়েছিল। চারদিকে ধ্বনিত হয়েছিল স্লোগান, “তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা, মেঘনা, যমুনা।”
তোফায়েল ভাই আরও বলেছিলেন, “আগে সিরাজ ভাইয়ের সঙ্গে শেরাটনে কিংবা তাঁর বাসায় গিয়ে দেখা করতাম। এখন রাজনীতিতে সেই সহনশীলতা নেই। আমাদের পেছনে লোক লাগানো হয়, রিপোর্ট করা হয়, গল্প বানানো হয়। কী যে বলি…।
একটু আক্ষেপের সুরে তিনি বলেছিলেন, “বঙ্গবন্ধু আমাকে দিয়ে কারাগারে থাকা শাহ আজিজুর রহমানের পরিবারের কাছে টাকা পাঠাতেন। সবুর খানকে মুক্তি দিয়েছিলেন। আর এখন আমরা ব্যক্তিগত সম্পর্কও রাখতে পারব না! এটা কেমন রাজনীতি!”
এমনই ছিল তোফায়েল আহমেদ ও সিরাজুল আলম খানের সম্পর্ক, রাজনৈতিক মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে উঠে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আস্থা ও দীর্ঘদিনের বন্ধনের এক অনন্য উদাহরণ।
লেখকঃ বিশিষ্ট সাংবাদিক
