খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১ই জুলাই ২০২৬, ৪:১৩ পিএম

দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে তৈরি হওয়া সাময়িক শীতলতা কাটিয়ে জাপানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের উন্নয়ন অংশীদারত্বকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে চায় বর্তমান বিএনপি সরকার। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদে বেশ কিছু মেগা প্রকল্পের ব্যয় ও প্রক্রিয়া নিয়ে টোকিওর সঙ্গে যে একধরনের দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, তা আলোচনার টেবিলে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ঢাকার যানজট নিরসনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি নতুন মেট্রোরেল প্রকল্প (লাইন-১ ও লাইন-৫) এবং হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নবনির্মিত তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব জাপানের হাতেই রাখার নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে।
রাজধানীতে প্রস্তাবিত নতুন দুটি মেট্রোরেল পথে জাপানি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর উচ্চ নির্মাণ ব্যয় প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে মূলত এই টানাপোড়েনের সূত্রপাত। পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তী সরকার এই উচ্চ ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে প্রকল্প দুটির প্রক্রিয়াগত কাজ সাময়িকভাবে স্থগিত রেখেছিল। তবে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এই অচলাবস্থা কাটানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। সরকার চাইছে প্রকল্পগুলোর কাজ সচল রাখার পাশাপাশি কীভাবে আলোচনা ও দর-কষাকষির মাধ্যমে ব্যয় কমিয়ে আনা যায়। এ লক্ষ্যে ইতিমধ্যে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ সাত সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কারিগরি কমিটি গঠন করেছে।
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশীদ সরকারের এই অবস্থানের কথা নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, জাপানের অর্থায়নেই নতুন দুটি মেট্রোরেল রুট নির্মিত হবে—এটি সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত। তবে দেশের জনগণের ওপর ঋণের বোঝা যাতে সাশ্রয়ী হয়, সে জন্য জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা জাইকার সঙ্গে ব্যয় হ্রাসের বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা চলছে। খুব দ্রুতই এর একটি সম্মানজনক সুরাহা হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে জাপানের অবদান অপরিসীম। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণের স্থিতি ছিল ৭ হাজার ৭২৮ কোটি মার্কিন ডলার, যার ১৮ শতাংশেরই জোগান দিয়েছে জাপান। অত্যন্ত সহজ শর্ত ও নমনীয় সুদের কারণে বাংলাদেশের কাছে জাপানি ঋণ সবসময়ই অগ্রাধিকার পেয়ে আসছে। ঢাকার প্রথম মেট্রোরেল (এমআরটি-৬), মহেশখালীর মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং যমুনা নদীর ওপর বঙ্গবন্ধু রেল সেতুর মতো মেগা প্রকল্পগুলো জাইকার অর্থায়নেই বাস্তবায়িত হচ্ছে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলোর আকাশচুম্বী ব্যয় নিয়ে খোদ সরকারি দপ্তরেই জোর বিতর্ক শুরু হয়। ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) এক তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, নবনির্মিত উত্তরা-মতিঝিল মেট্রোরেল নির্মাণে প্রতি কিলোমিটারে যেখানে খরচ হয়েছিল ১ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা, সেখানে নতুন দুটি লাইনের জন্য প্রতি কিলোমিটারে প্রস্তাবিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৩,৬১৮ কোটি টাকা। অথচ প্রতিবেশী দেশ ভারতে জমি অধিগ্রহণ বাদে প্রতি কিলোমিটার মেট্রোরেল নির্মাণে খরচ হয় মাত্র ১৫০ থেকে ৪৫০ কোটি টাকা।
২০১৯ সালে অনুমোদনের সময় বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর এবং নতুনবাজার থেকে পূর্বাচল পর্যন্ত (এমআরটি লাইন-১) প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ৫২,৫৬১ কোটি টাকা। আর হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত (এমআরটি লাইন-৫) রুটটির ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪১,২৩৮ কোটি টাকা। জাইকার সাম্প্রতিক সংশোধিত প্রস্তাবে এই দুটি প্রকল্পের ব্যয় যথাক্রমে ৮৪ শতাংশ ও ১১৩ শতাংশ বাড়িয়ে ৯৬,৫০০ কোটি এবং ৮৮,০০০ কোটি টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়।
ডিএমটিসিএলের তৎকালীন অভিজ্ঞ প্রশাসন এই অস্বাভাবিক খরচের তীব্র আপত্তি জানালে তৎকালীন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় প্রকল্পটি পর্যালোচনার জন্য স্থগিত করে। তবে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক দূরত্ব মেটাতে সচিবালয় ও কূটনৈতিক স্তরে অন্তত চারটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। জাইকার পক্ষ থেকে অবশ্য যুক্তি দেওয়া হচ্ছে যে, নতুন দুটি লাইনের বড় অংশই মাটির নিচ দিয়ে (আন্ডারগ্রাউন্ড) যাবে। এছাড়া ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন, নির্মাণ সামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি এবং গাবতলী ও ভাটারার মতো স্টেশনগুলোর নকশা পরিবর্তনের কারণে ২০১৯ সালের তুলনায় খরচ অনেক বেড়েছে।
প্রকল্পগুলোর ব্যয়, ঋণের ধরন এবং পরিচালন সংক্রান্ত সামগ্রিক পরিসংখ্যানগুলো নিচে একটি খতিয়ানের মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:
| বিবরণ ও সূচক | সংশ্লিষ্ট আর্থিক ও অন্যান্য তথ্য |
| ৩০ জুন ২০২৫ পর্যন্ত বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণ স্থিতি | ৭,৭২৮ কোটি মার্কিন ডলার |
| বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণে জাপানের অংশ | ১৮ শতাংশ |
| উত্তরা-মতিঝিল মেট্রোরেল (এমআরটি-৬) প্রতি কিমি নির্মাণ ব্যয় | ১,৫৭৪ কোটি টাকা |
| নতুন দুই মেট্রোরেল রুটে প্রতি কিমি প্রস্তাবিত ব্যয় | ৩,৬১৮ কোটি টাকা |
| ভারতে প্রতি কিলোমিটার মেট্রোরেল নির্মাণ গড় ব্যয় | ১৫০ থেকে ৪৫০ কোটি টাকা |
| এমআরটি লাইন-১ প্রকল্পের মূল প্রাক্কলিত ব্যয় (২০১৯) | ৫২,৫৬১ কোটি টাকা |
| এমআরটি লাইন-১ প্রকল্পের জাইকা প্রস্তাবিত সংশোধিত ব্যয় | ৯৬,৫০০ কোটি টাকা (৮৪% বৃদ্ধি) |
| এমআরটি লাইন-৫ প্রকল্পের মূল প্রাক্কলিত ব্যয় (২০১৯) | ৪১,২৩৮ কোটি টাকা |
| এমআরটি লাইন-৫ প্রকল্পের জাইকা প্রস্তাবিত সংশোধিত ব্যয় | ৮৮,০০০ কোটি টাকা (১১৩% বৃদ্ধি) |
| বিমানবন্দর তৃতীয় টার্মিনাল প্রকল্পের মোট নির্মাণ ব্যয় | ২১,০০০ কোটি টাকার বেশি |
| তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনায় জাপানি কনসোর্টিয়ামের রাজস্ব অংশ | ৭৩ শতাংশ |
| তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনায় বাংলাদেশের রাজস্ব অংশ | ২৭ শতাংশ |
| জাপানি ঋণের পূর্ববর্তী সুদের হার (গত বছরের অক্টোবর) | ২.৯ শতাংশ |
| জাপানি ঋণের বর্তমান সুদের হার (১ এপ্রিল থেকে কার্যকর) | ৩.৬ শতাংশ |
দীর্ঘদিন ঝুলে থাকার পর বিমানবন্দরের অত্যাধুনিক তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনা ও গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের কাজটিও শেষ পর্যন্ত জাপানি কনসোর্টিয়ামকে দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়েছে। এই জোটে রয়েছে বিশ্বখ্যাত জাপান এয়ারপোর্ট টার্মিনাল কোম্পানি, সুমিতোমো করপোরেশন, নিপ্পন কোয়েই এবং নারিতা ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট করপোরেশন। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম জানিয়েছেন, চলতি মাসের মধ্যেই বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এই চার কোম্পানির জোটের চুক্তি সই হতে যাচ্ছে। চুক্তি অনুযায়ী, রাজস্ব ভাগাভাগির ক্ষেত্রে জাপান পাবে ৭৩ শতাংশ এবং বাংলাদেশ পাবে ২৭ শতাংশ।
এদিকে, গত ১ এপ্রিল থেকে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে জাপান বিশ্বব্যাপী তাদের ঋণের সুদের হার ২.৯ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩.৬ শতাংশ করেছে। আকস্মিক এই সুদের হার বৃদ্ধির চাপ সামলাতে বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ইতিমধ্যে জাপানের অর্থমন্ত্রীকে একটি বিশেষ চিঠি পাঠিয়েছেন। চিঠিতে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট ও বাংলাদেশের এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) উত্তরণের সময়সীমা ২০২৯ সাল পর্যন্ত পিছিয়ে যাওয়ার বাস্তবতায় আগামী তিন বছরের জন্য সুদের হার আগের নমনীয় অবস্থায় রাখার জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে।
আজ হোলি আর্টিজান বেকারিতে ঘটে যাওয়া নির্মম জঙ্গি হামলার এক দশক পূর্ণ হচ্ছে। এই হামলায় নিহত সাত জাপানি নাগরিকের স্মরণে আয়োজিত বিশেষ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পাঁচ দিনের সফরে ঢাকায় আসছেন জাইকার প্রেসিডেন্ট তানাকা আকিহিকো। তাঁর এই সফরে সরকারের শীর্ষ মহলের সঙ্গে বৈঠকে প্রকল্পগুলোর ব্যয় যৌক্তিকীকরণ এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বরফ গলে যাওয়ার ক্ষেত্রে বড় ধরনের অগ্রগতি হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভূরাজনীতি ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় জাপানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত জরুরি, তবে একই সঙ্গে মেগা প্রকল্পের খরচের লাগাম টেনে ধরার প্রক্রিয়াটিও সমান্তরালভাবে চালিয়ে যাওয়া উচিত।
মন্তব্য