খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৬ই মে ২০২৬, ১২:২৮ এএম

ভোলার চরফ্যাশনে পেশাগত দায়িত্ব পালন ও অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় স্থানীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ সাতজন সাংবাদিক এবং একজন রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে সাইবার নিরাপত্তা আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে। এই মামলাটি করেছেন উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক (বহিষ্কৃত নেতা) মোতাহার হোসেন আলমগীর মালতিয়া। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর ভোলার সাংবাদিক মহলে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিন্দার ঝড় বইছে।
Table of Contents
গত ২৮ এপ্রিল বরিশাল সাইবার ক্রাইম ট্রাইব্যুনালে মামলাটি দায়ের করা হয়। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে পরবর্তী প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন। মামলার উল্লেখযোগ্য আসামিরা হলেন:
জুলফিকার মাহামুদ নিয়াজ: সভাপতি, চরফ্যাশন প্রেসক্লাব (প্রতিনিধি, বাংলাদেশের আলো)।
কামাল গোলদার: সাধারণ সম্পাদক, চরফ্যাশন প্রেসক্লাব (প্রতিনিধি, দৈনিক ইনকিলাব)।
শহিদুল ইসলাম জামাল: যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (প্রতিনিধি, দৈনিক সংবাদ)।
নোমান সিকদার: যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (প্রতিনিধি, দৈনিক সমকাল)।
সাইফুল ইসলাম মুকুল: প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক (প্রতিনিধি, দৈনিক বাংলা)।
আবু সিদ্দিক: নির্বাহী সদস্য (প্রতিনিধি, আগামীর সময়)।
আমিনুল ইসলাম: সদস্য (প্রতিনিধি, যায়যায়দিন)। এছাড়া এই মামলায় উপজেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক কাজী মনজুর হোসেনকেও আসামি করা হয়েছে।
ভুক্তভোগী সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই মামলার নেপথ্যে ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা ও পেশাগত কাজে বাধা দেওয়ার উদ্দেশ্য রয়েছে। ঘটনার সূত্রপাত ঘটে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) একটি পরিচিতি সভায়। অভিযোগ রয়েছে, ওই সভায় মামলার বাদী মোতাহার হোসেন আলমগীর মালতিয়া উপস্থিত সাংবাদিকদের ‘হলুদ সাংবাদিক’ ও ‘চাঁদাবাজ’ বলে কটূক্তি করেন।
এ ঘটনার প্রতিবাদে চরফ্যাশন প্রেসক্লাব থেকে তাকে একটি কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিশ পাঠানো হয়। উক্ত নোটিশের অনুলিপি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ায় ক্ষিপ্ত হয়ে তিনি এই সাইবার মামলাটি দায়ের করেন। সাংবাদিকদের দাবি, নিজের করা কটূক্তির দায় এড়াতে এবং গণমাধ্যমকর্মীদের কণ্ঠরোধ করতেই এই হয়রানিমূলক মামলার আশ্রয় নেওয়া হয়েছে।
সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সাইবার নিরাপত্তা আইনের অপপ্রয়োগের এই ঘটনায় স্থানীয় সংবাদকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। তারা বলছেন, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে পেশাদার সাংবাদিকদের এভাবে আইনি গ্যাঁড়াকলে ফেলা মুক্ত সাংবাদিকতার অন্তরায়। চরফ্যাশনের সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ এক যৌথ বিবৃতিতে অবিলম্বে এই মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন। তারা হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, যদি দ্রুত সময়ের মধ্যে মামলা প্রত্যাহার না করা হয়, তবে জেলার সকল সাংবাদিক সমাজ ঐক্যবদ্ধ হয়ে রাজপথে কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করতে বাধ্য হবে।
চরফ্যাশন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহামুদ আল ফরিদ এ প্রসঙ্গে সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী মামলাটি বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। আইন অনুযায়ী পরবর্তী ধাপের কাজ পরিচালনা করা হবে।
বাংলাদেশের সাইবার নিরাপত্তা আইন নিয়ে দীর্ঘদিনের যে বিতর্ক রয়েছে, এই ঘটনাটি তাতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সংবাদকর্মীরা মনে করছেন, তুচ্ছ ঘটনা কিংবা সত্য প্রকাশের প্রতিবাদে এই আইনের ব্যবহার সাংবাদিকদের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভোলার চরফ্যাশনে সাতজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে একই সাথে এই মামলা দায়ের হওয়ার বিষয়টি জাতীয় পর্যায়ের সাংবাদিক সংগঠনগুলোরও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
পৌর শহরের সচেতন নাগরিক ও সাধারণ পাঠকরা এই ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বলছেন, সাংবাদিকরা সমাজের দর্পণ। তাদের বিরুদ্ধে এমন হয়রানি বন্ধ না হলে মুক্ত মতপ্রকাশের পথ রুদ্ধ হবে। বর্তমানে মামলার আসামিরা আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন এবং পাশাপাশি জেলাজুড়ে আন্দোলনের প্রস্তুতিও চলছে। আদালতের নির্দেশনার প্রেক্ষিতে পুলিশি তদন্তে প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হবে বলে আশা করছেন স্থানীয়রা।
মন্তব্য