জি- লাইভ ডেস্ক
প্রকাশ: ১০ই আগস্ট ২০২৬, ১২:২০ পিএম

বাংলাদেশের চিত্রকলার ইতিহাসে এস এম সুলতান এমন এক শিল্পী, যাঁর ক্যানভাসে শুধু দৃশ্যপট নয়, উঠে এসেছে বাংলার মাটি, কৃষকের শ্রম, মানুষের সংগ্রাম এবং গ্রামীণ জীবনের শক্তি। তাঁর ছবির মানুষগুলো সাধারণ অর্থে দুর্বল বা অসহায় নয়। পেশিবহুল, বলিষ্ঠ ও প্রাণবন্ত শরীরের মাধ্যমে তিনি কৃষক, জেলে ও শ্রমজীবী মানুষকে উপস্থাপন করেছেন দেশের অর্থনীতি ও সমাজের অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে।
শেখ মোহাম্মদ সুলতান, যিনি ‘লাল মিয়া’ নামেও পরিচিত ছিলেন, ১৯২৩ সালের ১০ আগস্ট নড়াইলের মাছিমদিয়া গ্রামে এক দরিদ্র কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকার প্রতি তাঁর প্রবল আগ্রহ ছিল। পারিবারিক আর্থিক সংকটের কারণে তাঁর শিক্ষাজীবন সহজ ছিল না। পড়াশোনার পাশাপাশি বাবার কাজে সহযোগিতা করতে হয়েছে তাঁকে। তবে সীমাবদ্ধতা তাঁর শিল্পী হয়ে ওঠার পথ আটকে রাখতে পারেনি।
১৯২৮ সালে তিনি নড়াইল ভিক্টোরিয়া কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি হন। কৈশোরেই মানুষের মুখাবয়ব আঁকার মধ্য দিয়ে তাঁর শিল্পীসত্তার বিকাশ শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে কলকাতায় গিয়ে তিনি বৃহত্তর শিল্পপরিসরের সঙ্গে পরিচিত হন। চিত্রসমালোচক শাহেদ সোহরাওয়ার্দীর সান্নিধ্য তাঁর শিল্পজীবনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। চল্লিশের দশকে কলকাতা আর্ট স্কুলে তাঁর শিল্পশিক্ষার সুযোগ তৈরি হলেও প্রচলিত একাডেমিক রীতির মধ্যে নিজেকে পুরোপুরি সীমাবদ্ধ রাখেননি তিনি।
শিল্পী হিসেবে তাঁর পথচলা ছিল স্বতন্ত্র। ১৯৪৬ সালে সিমলায় তাঁর ছবির প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। পরবর্তী সময়ে নিউইয়র্ক, ওয়াশিংটন, শিকাগো, বোস্টন ও লন্ডনসহ বিভিন্ন শহরে তাঁর শিল্পকর্ম প্রদর্শিত হয়। আন্তর্জাতিক পরিসরে পরিচিতি পেলেও বিদেশের শিল্পজগত তাঁকে তাঁর শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি।
১৯৫৩ সালে নড়াইলে ফিরে আসার পর তাঁর শিল্পচর্চায় বাংলার গ্রামীণ জীবন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কৃষক, জেলে, শ্রমজীবী মানুষ, প্রকৃতি ও প্রাণী তাঁর শিল্পের প্রধান বিষয়গুলোর মধ্যে জায়গা করে নেয়। বিশেষ করে কৃষকের পেশিবহুল অবয়ব তাঁর চিত্রভাষার অন্যতম স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠে।
সুলতানের ছবিতে কৃষক শুধু একজন শ্রমিক নন; তিনি উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত সমাজের শক্তিশালী প্রতিনিধি। জমিতে কাজ করা মানুষের শরীরকে তিনি অতিরঞ্জিত শক্তি ও পেশির মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। এর মধ্য দিয়ে কৃষকের শ্রম, সক্ষমতা এবং সমাজে তাঁর মৌলিক ভূমিকার প্রতি শিল্পীর দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ পেয়েছে।
শিল্পের পাশাপাশি শিশুদের শিক্ষা ও সৃজনশীল বিকাশ নিয়েও তাঁর আগ্রহ ছিল। নড়াইলে শিশুদের সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি শিল্পচর্চার সুযোগ তৈরিতে তিনি উদ্যোগী হন। ‘নন্দন কানন’, ‘শিশুস্বর্গ’ ও ‘চারুপীঠ’-এর মতো উদ্যোগের সঙ্গে তাঁর নাম যুক্ত। শিশুদের জন্য একটি মুক্ত ও সৃজনশীল পরিবেশ গড়ে তোলার স্বপ্ন তাঁর জীবনদর্শনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।
সুলতানের জীবনযাপনও ছিল প্রচলিত ধারণার বাইরে। তিনি বাঁশি ও বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র বাজাতে পারতেন। পশুপাখির প্রতি তাঁর ছিল গভীর মমতা। তাঁর আশপাশে নানা প্রাণী ও পাখির বিচরণ ছিল। প্রকৃতি ও জীবজগতের সঙ্গে এই নিবিড় সম্পর্ক তাঁর শিল্পভাবনাতেও প্রতিফলিত হয়েছে।
তাঁর শিল্পে মানুষের পাশাপাশি প্রকৃতিও গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেয়েছে। হিংসা, বিদ্বেষ ও সংঘাতের বদলে মানবিকতা, সহমর্মিতা এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের আকাঙ্ক্ষা তাঁর শিল্পদর্শনের সঙ্গে যুক্ত ছিল। ফলে তাঁর চিত্রকর্মকে কেবল নান্দনিকতার দৃষ্টিতে দেখলে এর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বাদ পড়ে যায়। তাঁর শিল্পে মানুষের জীবন ও সমাজ সম্পর্কে একটি স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গিও প্রকাশ পেয়েছে।
বাংলাদেশের শিল্পাঙ্গনে তাঁর অবদানের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিও এসেছে। ১৯৮২ সালে তিনি একুশে পদক লাভ করেন। ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ চারুশিল্পী সংসদ সম্মাননা পান। ১৯৯৩ সালে তাঁকে দেওয়া হয় বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান স্বাধীনতা পদক।
এস এম সুলতানের উল্লেখযোগ্য জীবনপঞ্জি
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| পূর্ণ নাম | শেখ মোহাম্মদ সুলতান |
| পরিচিত নাম | লাল মিয়া |
| জন্ম | ১০ আগস্ট ১৯২৩ |
| জন্মস্থান | মাছিমদিয়া, নড়াইল |
| পারিবারিক পরিচয় | কৃষক পরিবার |
| বিদ্যালয়ে ভর্তি | ১৯২৮ সালে নড়াইল ভিক্টোরিয়া কলেজিয়েট স্কুল |
| শিল্পশিক্ষার পরিসর | কলকাতা |
| প্রথম দিকের গুরুত্বপূর্ণ প্রদর্শনী | ১৯৪৬ সালে সিমলা |
| নড়াইলে প্রত্যাবর্তন | ১৯৫৩ সালে |
| একুশে পদক | ১৯৮২ সালে |
| বাংলাদেশ চারুশিল্পী সংসদ সম্মাননা | ১৯৮৬ সালে |
| স্বাধীনতা পদক | ১৯৯৩ সালে |
| মৃত্যু | ১০ অক্টোবর ১৯৯৪ |
| মৃত্যুর স্থান | যশোর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল |
| সমাধিস্থল | নড়াইল |
জীবনের শেষ পর্যায়েও নড়াইলের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক অটুট ছিল। ১৯৯৪ সালের ১০ অক্টোবর যশোর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়। পরে নড়াইলের মাটিতেই তাঁর শেষ ঠিকানা হয়।
এস এম সুলতানের শিল্পের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল নিজের সমাজ ও মানুষের প্রতি তাঁর গভীর মনোযোগ। তিনি এমন মানুষদের ক্যানভাসে জায়গা দিয়েছেন, যাঁদের শ্রমের ওপর গ্রামীণ অর্থনীতি ও সমাজের বড় অংশ দাঁড়িয়ে আছে। তাঁর কৃষক, জেলে ও শ্রমজীবী চরিত্রগুলো তাই কেবল কোনো নির্দিষ্ট সময়ের গ্রামীণ জীবনের ছবি নয়; এগুলো বাংলার শ্রমনির্ভর মানুষের শক্তি ও অস্তিত্বের শিল্পিত প্রতীক।
বাংলাদেশের চিত্রকলায় তাঁর অবদান আজও স্বতন্ত্র। তাঁর রঙ, রেখা ও মানুষের শরীর নির্মাণের ধরন তাঁকে অন্য শিল্পীদের থেকে আলাদা করেছে। একই সঙ্গে তাঁর জীবন ও শিল্পচর্চা দেখিয়েছে, আন্তর্জাতিক পরিচিতি অর্জন করেও নিজের মাটি ও মানুষের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত থাকা সম্ভব।
আজ তাঁর জন্মদিনে এস এম সুলতানকে স্মরণ করার অর্থ শুধু একজন প্রয়াত শিল্পীর জীবনকে ফিরে দেখা নয়। তাঁর শিল্পের দিকে তাকালে বাংলার কৃষক, শ্রমজীবী মানুষ, প্রকৃতি এবং গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতার একটি বিশেষ সম্পর্কও চোখে পড়ে।
তাঁর ক্যানভাসে মাটি আছে, শ্রম আছে, মানুষের শক্তি আছে। আছে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সহাবস্থানের চিত্র। আর আছে এমন এক শিল্পভাবনা, যেখানে সাধারণ মানুষের জীবনই হয়ে উঠেছে শিল্পের প্রধান বিষয়।
এই কারণেই এস এম সুলতান বাংলাদেশের চিত্রকলার ইতিহাসে শুধু একজন খ্যাতিমান শিল্পী নন; তিনি মাটি ও মানুষের জীবনকে নিজের স্বতন্ত্র শিল্পভাষায় ধারণ করা এক অনন্য স্রষ্টা। তাঁর সৃষ্টি ও শিল্পদর্শন বাংলাদেশের শিল্প-ঐতিহ্যে দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।
মন্তব্য