খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ই জুন ২০২৬, ৫:২৪ পিএম

বিশ্বকাপের ইতিহাস সাধারণত দলীয় সাফল্যের গল্পে ভরপুর। কোনো দেশের শিরোপা জয়, কোনো দলের অপ্রত্যাশিত উত্থান কিংবা কোনো স্বপ্নভঙ্গ—এসবই আলোচনার কেন্দ্রে থাকে। তবে কিছু আসর থাকে, যেখানে দলীয় সাফল্যকে ছাপিয়ে ব্যক্তিগত নৈপুণ্য হয়ে ওঠে মূল আকর্ষণ। ২০২৬ বিশ্বকাপ এখন ঠিক সেই রকম এক ব্যক্তিগত মহারণের সাক্ষী।
এই মুহূর্তে গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন তিনজন—লিওনেল মেসি, কিলিয়ান এমবাপ্পে এবং আর্লিং হ্যালান্ড। ভিন্ন ভিন্ন স্টাইল, ভিন্ন ফুটবল দর্শন, কিন্তু লক্ষ্য একটাই—গোল করা এবং বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়া।
ডালাসে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে আর্জেন্টিনার জয়ে মূল ভূমিকা রাখেন মেসি। ম্যাচে তার জোড়া গোল শুধু জয়ই এনে দেয়নি, বরং বিশ্বকাপ ইতিহাসে তার অবস্থান আরও উঁচুতে নিয়ে গেছে। জার্মান কিংবদন্তি মিরোস্লাভ ক্লোসার ১৬ গোলের রেকর্ড ছাড়িয়ে এখন তার গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৮-এ। চলতি আসরে আর্জেন্টিনার পাঁচটি গোলের সবকটিই এসেছে তার অবদান থেকে, যা ৩৮ বছর বয়সেও তার অসাধারণ ধারাবাহিকতার প্রমাণ।
তবে মেসির খুব কাছেই আছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। ইরাকের বিপক্ষে নিজের শততম আন্তর্জাতিক ম্যাচে জোড়া গোল করে তিনি আবারও নিজের শ্রেষ্ঠত্বের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনটি বিশ্বকাপ মিলিয়ে এখন তার গোলসংখ্যা ১৬। ২০১৮ সালে ফ্রান্সকে শিরোপা জেতানো এবং ২০২২ সালে ফাইনালে পৌঁছানোর পর এবারও তিনি আছেন আলোচনার কেন্দ্রে। মাত্র ২৭ বছর বয়সে তার সামনে এখনও দীর্ঘ পথ পড়ে আছে, যা তাকে ভবিষ্যতে মেসির রেকর্ড ছোঁয়ার বড় সুযোগ দিচ্ছে।
ফরাসি বিশ্লেষকদের মতে, এবার এমবাপ্পের জন্য এটি হতে পারে ক্যারিয়ার-নির্ধারণী বিশ্বকাপ। তার গতি, ফিনিশিং এবং বড় ম্যাচে পারফর্ম করার ক্ষমতা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।
অন্যদিকে আলোচনায় ক্রমেই শক্ত অবস্থান তৈরি করছেন আর্লিং হ্যালান্ড। নরওয়ের এই স্ট্রাইকারকে বিশ্বকাপ শুরুর আগে খুব বেশি আলোচনায় রাখা হয়নি, কিন্তু অভিষেক আসরেই তিনি নজর কাড়ছেন। প্রথম দুই ম্যাচে টানা চার গোল করে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, তাকে উপেক্ষা করা ভুল হবে। আন্তর্জাতিক ফুটবলে ৫২ ম্যাচে তার গোল ৫৯—যা তার ভয়ংকর ফিনিশিং দক্ষতারই প্রমাণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মেসি খেলাকে নিয়ন্ত্রণ করেন, এমবাপ্পে গতি দিয়ে ভেঙে দেন প্রতিপক্ষের রক্ষণ, আর হ্যালান্ড যেন গোল করার জন্যই জন্ম নেওয়া এক নিখুঁত স্ট্রাইকার।
এই তিনজনের পাশাপাশি গোল্ডেন বুটের দৌড়ে আছেন জার্মানির ডেনিজ আন্দাভ, যিনি তিন গোল করেছেন। একইভাবে উজ্জ্বল হয়েছেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোও। উজবেকিস্তানের বিপক্ষে দুই গোল করে তিনি আবারও নিজের উপস্থিতি জানান দিয়েছেন, যা তাকে দৌড়ের বাইরে রাখার সুযোগ নেই।
চলতি আসরে দুই ম্যাচ শেষে মেসির গোল পাঁচটি, এমবাপ্পে ও হ্যালান্ডের চারটি করে। এমন দৃশ্য ফুটবল ইতিহাসে বিরল, যেখানে তিনজন তারকা একসঙ্গে এত দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছেন।
ফুটবল ইতিহাসে এর আগে এমন প্রতিদ্বন্দ্বিতা খুব কমই দেখা গেছে। শেষবার ১৯৫৪ বিশ্বকাপে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, যেখানে কয়েকজন স্ট্রাইকার দ্রুত গতিতে গোলের বন্যা বইয়ে দিয়েছিলেন।
প্রশ্ন এখন একটাই—শেষ হাসি কে হাসবেন? মেসি তার অভিজ্ঞতা দিয়ে, এমবাপ্পে তার গতি দিয়ে, নাকি হ্যালান্ড তার নিখুঁত গোলমেশিন দক্ষতা দিয়ে?
উত্তর সময়ই দেবে। তবে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, এই লড়াই ইতোমধ্যেই ২০২৬ বিশ্বকাপকে দিয়েছে এক অনন্য উত্তেজনা, যা ফুটবলপ্রেমীদের দীর্ঘদিন মনে থাকবে।
মন্তব্য