জিলাইভ বাংলা | সত্যের জয় অবধারিত

খুলনা মেডিক্যাল হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ড ও রোগী স্থানান্তরকালে মৃত্যু

খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে একটি আকস্মিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। হঠাৎ বিকট শব্দে বিস্ফোরণ এবং মুহূর্তের মধ্যে আগুনের তীব্রতা ছড়িয়ে পড়ায় হাসপাতালের রোগী, চিকিৎসক, সেবিকা ও স্বজনদের মধ্যে চরম আতঙ্ক, হুড়োহুড়ি ও ছোটাছুটি শুরু হয়। জীবন বাঁচাতে হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন সাধারণ মানুষ যে যেভাবে পেরেছেন ভবনের বাইরে খোলা জায়গায় চলে আসেন। আজ বুধবার (২০ মে, ২০২৬) ভোর আনুমানিক সাড়ে পাঁচটার দিকে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চারতলা বিশিষ্ট মূল চিকিৎসা ভবনের তৃতীয় তলায় অবস্থিত পুরাতন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের পাশের একটি গুদামঘরে এই অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়।

অग्नিকাণ্ডের খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মোট ১১টি ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে এবং প্রায় এক ঘণ্টার নিরলস চেষ্টায় আগুন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়। অগ্নিকাণ্ডের সময় হাসপাতালের এক নম্বর নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন থাকা ১৫ জন মুমূর্ষু রোগীকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। এই স্থানান্তর প্রক্রিয়ার সময় দুর্ভাগ্যজনকভাবে একজন আশঙ্কাজনক রোগীর মৃত্যু হয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে যে, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পূর্বেই ভোর পাঁচটার দিকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন অপর একজন রোগী মারা গিয়েছিলেন। আগুন থেকে বাঁচতে এবং উদ্ধার অভিযান পরিচালনাকালে দুইজন জৈত্র সেবিকাসহ মোট পাঁচজন আহত হয়েছেন।

খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের অগ্নিকাণ্ডের স্থান, ক্ষয়ক্ষতি, হতাহত এবং উদ্ধার অভিযানের সামগ্রিক বিবরণ নিচে একটি সুনির্দিষ্ট ছকের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:

অগ্নিকাণ্ডের প্রধান প্রধান সূচকসমূহসংশ্লিষ্ট সুনির্দিষ্ট তথ্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিবরণ
অগ্নিকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার স্থানতৃতীয় তলা, পুরাতন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের পাশের গুদামঘর, খুলনা
দুর্ঘটনার সুনির্দিষ্ট সময় ও তারিখবুধবার, ২০ মে, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ (ভোর আনুমানিক সাড়ে ৫টা)
আগুনের প্রাথমিক সম্ভাব্য কারণবৈদ্যুতিক গোলযোগ বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বিস্ফোরণ
নিয়ন্ত্রণকারী মোট উদ্ধারকারী দলফায়ার সার্ভিসের ১১টি সুনির্দিষ্ট ইউনিট
আগুন সম্পূর্ণ নিভিয়ে ফেলার সময়প্রায় ৪৫ মিনিটে নিয়ন্ত্রণ এবং ৫৫ মিনিটের মধ্যে সম্পূর্ণ নির্বাপণ
স্থানান্তরকালীন এবং পূর্বে মোট মৃত্যুস্থানান্তরকালে ১ জন এবং আগুন লাগার পূর্বে ভোর ৫টায় ১ জনের মৃত্যু
আহত ব্যক্তিদের মোট সংখ্যা ও পরিচয়২ জন সেবিকা, ২ জন হাসপাতালের কর্মী এবং ১ জন ফায়ার সার্ভিস কর্মী
আহতদের বর্তমান চিকিৎসাস্থলখুলনা সিটি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল

হাসপাতালের প্রত্যক্ষদর্শী স্বাস্থ্যকর্মী রেজাউল ঘটনার বিবরণ দিয়ে জানান, তৃতীয় তলার গুদামঘর থেকে আগুনের সূত্রপাত হওয়ার পরপরই চারদিকের পুরো এলাকা কালো ধোঁয়ায় অন্ধকার হয়ে যায়। বিশেষ করে অস্ত্রোপচার কক্ষ এবং অস্ত্রোপচার পরবর্তী পর্যবেক্ষণ ওয়ার্ডের ভেতরে ধোঁয়ার কারণে কোনো কিছু দেখা যাচ্ছিল না। এমন পরিস্থিতিতে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র ও অন্যান্য ওয়ার্ডের মুমূর্ষু রোগীদের পেছনের জরুরি দরজা দিয়ে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে বাইরে বের করে আনা হয়। পরবর্তীতে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ভবনের ভেতরে আটকে পড়া সেবিকাদের উদ্ধার করেন। ধোঁয়ার কারণে অসুস্থ হয়ে পড়া দুই সেবিকাকে চিকিৎসার জন্য একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক সরকার মাসুদ আহমেদ গণমাধ্যমকে জানান, ভোর ছয়টার দিকে প্রথম অগ্নিকাণ্ডের সংবাদ পেয়ে তাদের বয়রা স্টেশন থেকে তিনটি ইউনিট ঘটনাস্থলে এসে প্রাথমিক উদ্ধার কাজ শুরু করে। আগুনের ভয়াবহতা বিবেচনায় পরবর্তীতে আরও ইউনিট যুক্ত হয়ে মোট ১১টি ইউনিট একসাথে কাজ করে। উদ্ধার অভিযানের শুরুতে ভবনের সবদিকের প্রবেশদ্বারে তালাবদ্ধ থাকায় ভেতরে প্রবেশ করতে কিছুটা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন এবং বারান্দা থেকে আটকে পড়া চার থেকে পাঁচজনকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করেন। তিনি আরও জানান, প্রায় ৪৫ মিনিটের চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে এবং ৫৫ মিনিটের মধ্যে তা সম্পূর্ণ নির্বাপণ করা সম্ভব হয়। প্রাথমিক আলামত ও পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে ধারণা করা হচ্ছে যে, বৈদ্যুতিক গোলযোগ থেকেই এই আগুনের সূত্রপাত হয়েছে।

হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের প্রধান দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক দিলীপ কুমার জানান, পুরাতন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের পাশের একটি কক্ষে যেখানে পুরাতন কাপড় ও চিকিৎসা সরঞ্জাম রাখা ছিল, সেখান থেকেই মূলত আগুনের সূত্রপাত হয়। আগুন দ্রুত চারদিকে ছড়িয়ে পড়ার পর কক্ষের ভেতরে থাকা কয়েকটি অক্সিজেন সিলিন্ডার এবং একটি পুরোনো শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হয়। এই বিস্ফোরণের তীব্রতায় ভবনের দেয়ালের একটি অংশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং পুরো চিকিৎসা কেন্দ্রে ঘন বিষাক্ত ধোঁয়ার সৃষ্টি হয়। তিনি নিশ্চিত করেন, নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে থাকা ১৫ জন রোগীকে দ্রুত হাসপাতালের অন্য নিরাপদ ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হয়। এদের মধ্যে একজন রোগী স্থানান্তর করার সময় মারা যান এবং অপরজন আগুন লাগার পূর্বেই স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করেছিলেন।

খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নিরাপত্তা দায়িত্বে নিয়োজিত আনসার কমান্ডার আরিফুল ইসলাম জানান, আগুন নিয়ন্ত্রণের সময় ভবনের লোহার গ্রিল কেটে ভেতরে প্রবেশ করার চেষ্টা করা হয়েছিল। সে সময় অসাবধানতাবশত একটি গ্রিল ভেঙে নিচে পড়ে যাওয়ায় হাসপাতালের কর্মী সাইদুর রহমান (৫০), জ্যেষ্ঠ সেবিকা নওরিন, দিপালী, শারমিন এবং ফায়ার সার্ভিসের কর্মী তৌহিদ আহত হন। আহতদের উদ্ধার করে প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদানের পর উন্নত চিকিৎসার জন্য খুলনা সিটি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. হোসেন আলী জানিয়েছেন, অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদঘাটনের জন্য একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে এবং তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পরেই আগুন লাগার সুনির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিতভাবে জানা যাবে।

Tags :

বাংলা ডেস্ক । GLive24.com

সর্বশেষ খবর