খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১০ই জুলাই ২০২৬, ৬:১ পিএম

দেশের ইসলামী ব্যাংকিং খাত দীর্ঘদিন ধরেই আর্থিক ও ব্যবস্থাপনাগত নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সেই চাপের প্রভাব এবার আরও স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছে চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকের (জানুয়ারি–মার্চ ২০২৬) পরিসংখ্যানে। কয়েকটি ইসলামী ব্যাংকে পরিচালনা পর্ষদ নিয়ে বিতর্ক, তারল্য সংকট, খেলাপি ঋণের চাপ এবং আমানতকারীদের আস্থাহীনতার কারণে শুধু আমানতই কমেনি, একই সঙ্গে রপ্তানি আয়, আমদানি নিষ্পত্তি এবং প্রবাসী আয় সংগ্রহেও নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। তবে এসব চাপের মধ্যেও দেশের সামগ্রিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ইসলামী ব্যাংকগুলোর অবস্থান এখনো গুরুত্বপূর্ণ এবং বাজারে তাদের অংশীদারিত্ব শক্তিশালী রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রান্তিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ ২০২৬ শেষে দেশের ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৭৯ হাজার ৯৩৫ কোটি টাকা। ডিসেম্বর ২০২৫ শেষে যে পরিমাণ আমানত ছিল, তার তুলনায় কমেছে ১ হাজার ২৫৬ কোটি টাকা। যদিও এক বছর আগের একই সময়ের তুলনায় আমানতে ৮ দশমিক ৩৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। অর্থাৎ দীর্ঘমেয়াদে খাতটির প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলেও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে আস্থার সংকট স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, কয়েকটি ইসলামী ব্যাংকে পরিচালনা পর্ষদ পরিবর্তন, ব্যবস্থাপনায় অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ, দুর্বল সম্পদের পরিমাণ বৃদ্ধি এবং খেলাপি ঋণের বিস্তারের ফলে অনেক গ্রাহক তাদের আমানত অন্য ব্যাংকে স্থানান্তর করেছেন। এর ফলে তারল্যচাপ যেমন বেড়েছে, তেমনি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বৈদেশিক লেনদেনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, বর্তমানে দেশের মোট ব্যাংক আমানতের ২৩ দশমিক ৬২ শতাংশ ইসলামী ব্যাংকগুলোর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অন্যদিকে মোট ঋণ ও বিনিয়োগের প্রায় ২৯ দশমিক ৯ শতাংশ পরিচালিত হচ্ছে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে। মার্চ শেষে ইসলামী ব্যাংকগুলোর মোট ঋণ ও বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ২৬ হাজার ৮৮৯ কোটি টাকা, যা আগের প্রান্তিকের তুলনায় ১ হাজার ৮১৮ কোটি টাকা বেশি।
তবে বিনিয়োগ বৃদ্ধির তুলনায় আমানতের গতি দুর্বল হওয়ায় বিনিয়োগ-আমানত অনুপাত (আইডিআর) ০.৯৪ থেকে কমে ০.৯০-এ নেমে এসেছে। একই সময়ে অতিরিক্ত তারল্যের পরিমাণ কমে হয়েছে ১৯ হাজার ২০৪ কোটি টাকা। এক বছর আগে এই পরিমাণ ছিল ১৯ হাজার ৩৯২ কোটি টাকা। অর্থাৎ বছরে অতিরিক্ত তারল্য কমেছে ১৮৮ কোটি টাকা। যদিও এই হ্রাস খুব বড় নয়, তবু এটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে খাতটি এখনো তারল্যচাপ থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারেনি।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, কিছু ইসলামী ব্যাংকে আমানত প্রত্যাহারের চাপ, খেলাপি ঋণের বৃদ্ধি এবং শরিয়াহসম্মত স্বল্পমেয়াদি তারল্য ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতার কারণে কয়েকটি ব্যাংককে জরুরি তারল্য সহায়তা দিতে হয়েছে। পাশাপাশি ইসলামী আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজার চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে তারল্য বিনিময় আরও কার্যকরভাবে পরিচালিত করা সম্ভব হয়।
শুধু অভ্যন্তরীণ ব্যাংকিং কার্যক্রমেই নয়, বৈদেশিক বাণিজ্যেও দুর্বলতার প্রভাব পড়েছে। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে ইসলামী ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে রপ্তানি আয় হয়েছে ৩০ হাজার ৩২১ কোটি টাকা, যা আগের প্রান্তিকের তুলনায় ৩ দশমিক ৮৪ শতাংশ কম। একই সময়ে আমদানি নিষ্পত্তি ১১ দশমিক ৫১ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৪১ হাজার ৫৯৬ কোটি টাকায়। প্রবাসী আয় সংগ্রহও কমেছে ৯ দশমিক ১৮ শতাংশ, যা নেমে এসেছে ২৫ হাজার ১১ কোটি টাকায়। তবে ইতিবাচক দিক হলো, দেশের মোট প্রবাসী আয়ের ২০ দশমিক ৫৪ শতাংশ এখনো ইসলামী ব্যাংকগুলোর মাধ্যমেই দেশে এসেছে, যা এই খাতের প্রতি উল্লেখযোগ্য গ্রাহক নির্ভরতার প্রতিফলন।
| সূচক | সর্বশেষ অবস্থা |
|---|---|
| মোট আমানত | ৪,৭৯,৯৩৫ কোটি টাকা |
| প্রান্তিকভিত্তিক আমানত পরিবর্তন | -১,২৫৬ কোটি টাকা |
| বার্ষিক আমানত প্রবৃদ্ধি | ৮.৩৫% |
| মোট ঋণ ও বিনিয়োগ | ৫,২৬,৮৮৯ কোটি টাকা |
| প্রান্তিকভিত্তিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি | ১,৮১৮ কোটি টাকা |
| বিনিয়োগ-আমানত অনুপাত (আইডিআর) | ০.৯০ |
| অতিরিক্ত তারল্য | ১৯,২০৪ কোটি টাকা |
| রপ্তানি আয় | ৩০,৩২১ কোটি টাকা |
| আমদানি নিষ্পত্তি | ৪১,৫৯৬ কোটি টাকা |
| প্রবাসী আয় | ২৫,০১১ কোটি টাকা |
| মোট ব্যাংক আমানতে অংশ | ২৩.৬২% |
| মোট ব্যাংক ঋণ ও বিনিয়োগে অংশ | ২৯.৯% |
বিনিয়োগ খাতের বিশ্লেষণে দেখা যায়, ইসলামী ব্যাংকগুলোর অর্থায়নের সবচেয়ে বড় অংশ গেছে বৃহৎ শিল্প খাতে, যেখানে মোট বিনিয়োগের ৩৯ দশমিক ৯৭ শতাংশ ব্যয় হয়েছে। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বাণিজ্য খাত, যার অংশ ৩৩ দশমিক ১২ শতাংশ। অন্যদিকে কৃষি, মৎস্য ও বন খাতে বিনিয়োগের অংশ মাত্র ১ দশমিক ৮২ শতাংশ এবং সিএমএসএমই খাতে ৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ।
তবে কৃষি অর্থায়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। মার্চ শেষে কৃষি খাতে ইসলামী ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ বেড়ে ১৭ হাজার ৯৮০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা আগের প্রান্তিকের তুলনায় প্রায় ২ হাজার ৬৪০ কোটি টাকা বেশি। এ খাতে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের হার বেড়ে হয়েছে ৯৩ দশমিক ৩৭ শতাংশ। একই সঙ্গে গ্রিন ফাইন্যান্স, নারী উদ্যোক্তা অর্থায়ন এবং ইসলামী ক্ষুদ্র অর্থায়নেও ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। বর্তমানে গ্রিন ফাইন্যান্সের পরিমাণ ১৯ হাজার ৭৭২ কোটি টাকা, নারী উদ্যোক্তা অর্থায়ন ৫ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা এবং ইসলামী ক্ষুদ্র অর্থায়নের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৬৫৫ কোটি টাকা।
বর্তমানে দেশে ১০টি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকের ১ হাজার ৭০০টি শাখা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এছাড়া ১৭টি প্রচলিত ব্যাংকের ৪৯টি ইসলামী শাখা এবং ২১টি ব্যাংকের ৯৭৬টি ইসলামী ব্যাংকিং উইন্ডো চালু রয়েছে। সব মিলিয়ে ইসলামী ব্যাংকিং সেবাকেন্দ্রের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৭৪৯টি। মার্চ শেষে এ খাতে কর্মরত জনবলের সংখ্যা বেড়ে ৪৮ হাজার ৯৩৫ জন হলেও ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় কর্মী সংখ্যা কমেছে ৩ হাজার ২৯৬ জন।
অর্থনীতিবিদ এম হেলাল আহমেদের মতে, সুশাসনের ঘাটতি, তারল্য সংকট এবং ব্যবস্থাপনার প্রতি আস্থার অভাবে অনেক গ্রাহক ও ব্যবসায়ী তাদের লেনদেন অন্য ব্যাংকে সরিয়ে নিয়েছেন। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে রপ্তানি আয় ও প্রবাসী আয়ের প্রবাহে। তাঁর মতে, গ্রহণযোগ্য পরিচালনা পর্ষদ গঠন, আর্থিক অবস্থার স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পেশাদার ব্যাংক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে ধীরে ধীরে গ্রাহকদের আস্থা ফিরে আসতে পারে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেছেন, প্রান্তিকভিত্তিক তথ্যের ক্ষেত্রে আমানতের কিছুটা ওঠানামা স্বাভাবিক। তাই একটি মাত্র প্রান্তিকের তথ্য দেখে সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকিং খাতের সুশাসন, জবাবদিহি, সম্পদের গুণগত মান এবং তারল্য পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও তদারকি কার্যক্রমও ধাপে ধাপে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে, যাতে খাতটির প্রতি জনআস্থা পুনরুদ্ধার এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা যায়।
মন্তব্য