খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৪ই মার্চ ২০২৬, ৫:১৮ এএম

দেশের প্রতিকূল অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং ব্যবসায়ীদের দাবির মুখে চলমান ঋণ নবায়নের (Continuous Loan Renewal) ক্ষেত্রে কঠোর বিধিনিষেধ শিথিল করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। মঙ্গলবার (৩ মার্চ) কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধান ও নীতি বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে দেশের সকল তফসিলি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠানো হয়েছে। এই নতুন নির্দেশনার ফলে ব্যবসায়ীদের জন্য ঋণ পরিশোধ ও ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে বড় ধরনের স্বস্তি আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
Table of Contents
গত আট মাস আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি কঠোর নির্দেশনা জারি করেছিল, যেখানে বলা হয়েছিল যে—কোনো ব্যবসায়ী বা শিল্পোদ্যোক্তা যদি তার ঋণের সীমাতিরিক্ত অংশ (Over Limit) পরিশোধ না করেন, তবে সেই ঋণ নবায়ন করা যাবে না। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় অনেক ব্যবসায়ী এই শর্ত পূরণ করতে হিমশিম খাচ্ছিলেন। মঙ্গলবার জারিকৃত নতুন নির্দেশনায় সেই পূর্ববর্তী কড়াকড়ি বাতিল করা হয়েছে।
এখন থেকে কোনো ঋণ যদি ‘মন্দ’ বা ‘ক্ষতিজনক’ (Bad or Loss) মানে খেলাপি হওয়ার আগ পর্যন্ত থাকে, তবে তা নবায়ন করার সুযোগ পাবেন গ্রাহক। অর্থাৎ, ঋণটি শ্রেণিকরণ বা খেলাপি হওয়ার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত ব্যাংকগুলো তাদের বিবেচনায় এটি নবায়ন করতে পারবে। এই বিশেষ সুবিধাটি আগামী ২০২৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বলবৎ থাকবে।
| প্রধান ক্ষেত্র | পূর্ববর্তী নিয়ম (কঠোর) | বর্তমান সংশোধিত নিয়ম (শিথিল) |
| সীমাতিরিক্ত ঋণ পরিশোধ | নবায়নের জন্য সীমাতিরিক্ত অংশ পরিশোধ বাধ্যতামূলক ছিল। | পরিশোধ না করলেও ব্যাংক নিজস্ব বিবেচনায় নবায়ন করতে পারবে। |
| খেলপি ঋণের মানদণ্ড | সামান্য অনিয়মেই নবায়ন আটকে যেত। | ‘মন্দ’ মানে খেলাপি না হওয়া পর্যন্ত নবায়নের সুযোগ থাকবে। |
| মেয়াদকাল | অনির্দিষ্ট বা তাৎক্ষণিক কার্যকর ছিল। | ২০২৭ সাল পর্যন্ত এই সুবিধা কার্যকর থাকবে। |
| মূল উদ্দেশ্য | ঋণ আদায় ত্বরান্বিত করা। | ব্যবসায়ীদের তারল্য সংকট কাটানো ও উৎপাদন সচল রাখা। |
উল্লেখ্য যে, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদ মো. মোস্তাকুর রহমান গত ২৬ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। দায়িত্ব গ্রহণের এক সপ্তাহ পার হওয়ার আগেই তিনি বেসরকারি খাত ও শিল্পায়নের গতি বাড়াতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করলেন। মঙ্গলবারের এই নির্দেশনার পাশাপাশি রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য আরও একটি বিশেষ সুবিধার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
রপ্তানিকারকদের জন্য বিশেষ ঋণ সুবিধার আওতায়, তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ফেব্রুয়ারি মাসের শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন পরিশোধের জন্য ব্যাংক থেকে এক বছর মেয়াদি বিশেষ ঋণ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। বিশ্ববাজারে অস্থিরতা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন সচল রাখতে এই তারল্য সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট শিল্পপতিরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঋণ নবায়নের এই শিথিলতা ব্যাংক খাতের জন্য এক ধরনের চ্যালেঞ্জও বটে। এতে করে সাময়িকভাবে ঋণের প্রবাহ বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদে খেলাপি ঋণের ঝুঁকি যেন না বাড়ে, সেদিকে নজর রাখতে হবে। তবে বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ডলার সংকটের সময়ে ব্যবসায়ীদের হাতে নগদ অর্থের প্রবাহ নিশ্চিত করা জরুরি ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সিদ্ধান্ত উৎপাদনশীল খাতকে স্থিতিশীল করতে এবং রপ্তানি আয় বাড়াতে সহায়ক হবে।
বিশেষ করে কুটির, ক্ষুদ্র ও মাঝারি (CMSME) উদ্যোক্তারা, যারা প্রায়শই সীমাতিরিক্ত ঋণ পরিশোধ করতে না পেরে আইনি জটিলতায় পড়তেন, তারা এই সিদ্ধান্তের ফলে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন। ২০২৭ সাল পর্যন্ত এই দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা বিনিয়োগকারীদের মনে আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মন্তব্য